আজ শক্তির মহড়া তারপর...

মরিয়া লড়াইয়ের আভাস-ইঙ্গিত রেখেই আজ শনিবার মাঠে নামছে বিএনপি। সেজন্য তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, তল্লাশির বাধা পেরিয়ে আসতে হচ্ছে। একইভাবে মোক্ষম জবাব দেওয়ার জন্য নামছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দুই দলই জিততে চায়। এতে যে জনমনে আশঙ্কা, দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার জন্ম হয়েছে, সেটাও পাড়া-মহল্লার আলোচনায় বোঝা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সতর্ক। তারাও প্রস্তুতি নিয়ে নেমেছে।

কয়েক দিন ধরেই বিএনপির মহাসমাবেশ এবং আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ নিয়ে দুপক্ষের নেতাদের মধ্যে কথার লড়াই চলছে। বিএনপি বলছে, তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করবে। তাতে সন্দেহ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ বলছে, নাশকতা বা সহিংসতা করলে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। সমাবেশের আগের দিন দুই দলের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করেছেন। কিন্তু নাশকতা হবে না এ নিশ্চয়তা কেউ দেননি।

বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, সরকার আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, বিএনপির দুরভিসন্ধি আছে।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, মহাসমাবেশে বাধা দিলে তারা কঠোর কর্মসূচি দেবেন। সরকারের পদত্যাগে তাদের এক দফা দাবি না মানলে ঘেরাও কর্মসূচি আসতে পারে বলেও জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারায় থাকার কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারে সরকারি দলের সহযোগী যুবলীগের নেতাকর্মীদের লাঠি হাতে মহাসড়কে নামতে দেখা গেছে।

দুই দলের এমন অবস্থান এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ মানুষ শঙ্কিত। দুই দলের আজকের কর্মসূচির পর আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, সেটা নিয়েও মানুষের কৌতূহল রয়েছে।

বিএনপি-আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিয়ে এমন উত্তেজনার মধ্যে অনুমতি দেওয়া না দেওয়া নিয়েও টানাপড়েন ছিল। পুলিশের সঙ্গে চিঠি চালাচালি হয়েছে দুই দলের। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বিকল্প ভেন্যুর প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত একগুচ্ছ শর্ত দিয়ে বিএনপিকে নয়াপল্টনে এবং আওয়ামী লীগকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। তবে দুই দলকে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

বিএনপিকে দেওয়া ২০ শর্তের মধ্যে আরও আছে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়ে বক্তব্য দিতে পারবে না। সমানসংখ্যক শর্ত দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগকে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে অনুমতি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

আজকের কর্মসূচি ঘিরে গতকাল জুমার পর ঢাকার সব থানা-ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা খন্ড খন্ড মিছিল করেছেন। মোটরবাইক শোভাযাত্রা করেছেন ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায়। দলের সমর্থনে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও নিজের কর্মী বাহিনী নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় মিছিল করেন। এসব মিছিল কোনো কোনোটি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে এসে জড়ো হয়। সেখানে সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন নেতারা বক্তব্য রাখেন। বিকেলে কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি জানান, বেলা ১১টা থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের শান্তি সমাবেশ শুরু হবে। দুপুর আড়াইটায় মূল সমাবেশ হবে। সেখানে কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখবেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি যা করবে সেটার মোকাবিলা করবে আওয়ামী লীগ। এর বাইরে ক্ষমতাসীনদের কোনো পরিকল্পনা নেই।

নিজেদের দলের নেতাকর্মীকে আর ঘরে ফিরে যাওয়া যাবে না এমন নির্দেশনা দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ লড়াই গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার লড়াই, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লড়াই।’

সাভার প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে লাঠি হাতে সাভার থানা স্ট্যান্ডের পাশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। লাঠি হাতে মহাসড়কের পাশে অবস্থানের বিষয়ে আশুলিয়া থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কবির হোসেন সরকার বলেন, ‘জামায়াত-বিএনপি যাতে কোনো নৈরাজ্য করতে না পারে, সেজন্য লাঠি হাতে আমরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছি। দিনব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হবে।’

অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ছেন। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে যাত্রীদের ব্যাগসহ জিনিসপত্র তল্লাশি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযোগ পাওয়া গেছে, মোবাইল ফোন ঘেঁটে বিএনপি নেতাকর্মী সন্দেহ হলেই আটক করা হচ্ছে বা নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, নাশকতা যাতে না হয়, সেজন্য নিয়মিত তল্লাশির অংশ হিসেবেই তারা এমন কার্যক্রম চালাচ্ছে।

এ ছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পুরনো মামলার আসামি, যাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা আছে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

এমন অবস্থায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও আমরা আগামীকালের (আজ) মহাসমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করব। সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। কর্মসূচি শেষে নেতাকর্মীরা ঘরে ফিরে যাবে এবং পরবর্তী কর্মসূচি পালনে প্রস্তুতি নেবে।’

সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ে বিএনপি সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে। অক্টোবরে লাগাতার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল দলটি। আজ মহাসমাবেশের পর নির্বাচন কমিশন ও সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি আসতে পারে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।

তবে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা ইতিপূর্বে বলেছেন, ‘মহাসমাবেশে হামলা কিংবা বাধা দিলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সকাল থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

গত ১৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশ থেকে আজকের কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য ইতিপূর্বে আমরা রাজপথের শরিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছি। আন্দোলন সংগ্রামের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে তাদের মতামত নিয়েছি। মহাসমাবেশ থেকে ইসি ও সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি আসতে পারে। আজ (গতকাল) রাতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভার্চুয়ালি সভা করবেন। সভায় সিদ্ধান্ত হবে কী কর্মসূচি আসবে।’

গতকাল রাতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহাসমাবেশের অনুমতি পাওয়া গেছে। রাতেই মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে মহাসমাবেশ সফল করতে আমরা সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা নির্ধারিত সময়ে মহাসমাবেশে অংশগ্রহণ করবেন।’

বিএনপির সমমনা দলগুলোর মধ্যে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি বেলা ১১টা বিজয়নগরে হোটেল ৭১-এর সামনে (বিজয় ৭১), জনতার অধিকার পার্টি দুপুর ২টায় বিজয়নগর পানির ট্যাংক মোড়ে, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ বিকেল ৩টায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে, জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী পরিষদ বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, বিকেল ৪টায় পুরানা পল্টন মোড়ে বাংলাদেশ লেবার পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর পূর্ব পান্থপথ এফডিসিসংলগ্ন তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে, গণতন্ত্র মঞ্চ বিকেল সাড়ে ৩টায় মৎস্য ভবনের পাশের রাস্তায় মহাসমাবেশ করবে।

২০ শর্তে অনুমতি : গতকাল রাতে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুই দলকেই কর্মসূচি পালনের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছি।’ তিনি জানান, বিএনপিকে নাইটিংগেল মোড় থেকে পুলিশ হাসপাতালের মোড় পর্যন্ত এলাকায় সমাবেশ ও মাইকিং সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ মহানগর নাট্যমঞ্চ থেকে মুক্তাঙ্গন পর্যন্ত তাদের সমাবেশ ও মাইকিং ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখবে। দুই দলের কেউ লাঠিসোঁটা সমাবেশে আনতে পারবে না, কোনো ব্যাগ বহন করতে পারবে না, রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো বক্তব্য দিতে পারবে না। জনদুর্ভোগ এড়াতে তারা যতটা সম্ভব স্বেচ্ছাসেবক রাখবে। তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা পুলিশকে সহযোগিতা করবে।

ডিএমপি কর্মকর্তা বলেন, দুই দলকে বলা হয়েছে তারা আইনশৃঙ্খলা অবনতি হওয়ার মতো কোনো কাজ করতে পারবে না। স্থান ব্যবহারের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে।