তামিমকে নিয়ে বিতর্কের প্রভাব অস্বীকার করেন না সাকিব

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৮৭ রানের হারের লজ্জার পর ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হলেন এক বদলে যাওয়া সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশ অধিনায়ক আত্মসমালোচনা যেমন করলেন, একই সঙ্গে মাঠের ভেতর-বাইরের অনেক কিছুকেই বিশ্বকাপে বাজে পারফরম্যান্সের কারণ হিসেবে তুলে আনলেন। তার চোখে এটা বাংলাদেশের স্মরণকালের বাজে পারফরম্যান্স। এছাড়া বিশ্বকাপের আগে তামিম ইকবালকে নিয়ে ওঠা বিতর্ক, তাতে নিজের জড়িয়ে যাওয়া, দলের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার কথা স্বীকার করেছেন হতাশ বাংলাদেশ অধিনায়ক। ডাচদের কাছে এমন হার হজম করা কঠিন, এখান থেকে ঘুড়ে দাঁড়ানো কঠিন জানিয়ে চেষ্টা করার কথাই বলেছেন সাকিব। সংবাদ সম্মেলনে বলা সাকিবের সওয়াল-জবাব পুরোটাই থাকছে এখানে-


ডাচদের কাছে হারের প্রতিক্রিয়ায়-
সাকিব: আমরা ভালো ব্যাটিং করতে পারিনি। বল হাতে আমরা খুব ভালো করেছিলাম। তবে ফিল্ডিংটা বাজে হয়েছে। ডাচদের ২ পয়েন্ট উপহার দিয়েছি। এটা দারুণ হতাশার একটা দিন। এরকম হার হজম করা কঠিণ। ডাচদের কৃতিত্ব দিচ্ছি। তারা দারুণ বোলিং করেছে। আমরা খুব বাজে শট খেলেছি।
ব্যাটারদের আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গে-
সাকিব: আমি জানি না কি হচ্ছে। আপনি যদি বিশ্বকাপে খেলা ছয় ম্যাচের পারফরম্যান্স সম্পর্কে বলতে বলেন, আমি বলবো মাহমুদুল্লাহ ভাই ও মুশফিকুর রহিম ভাই বাদে আমাদের ব্যাটিং ছিল ভীষণ নিম্নমানের। কেউই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারেনি।
অন্য দলগুলো ভারতীয় কন্ডিশনে ভালো বোলিং করছে, বাংলাদেশের বোলাররা কেন পারছে না?
সাকিব: আমার মনে হয় আমরা সবাই আত্মবিশ্বাসহীণতায় ভুগছি। কারণ বিশ্বকাপে আমাদের নিয়ে আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা ছিল, সেটা আমরা পূরণ করতে পারিনি। আমরা দুই বিভাগেই আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগছি। তবে আজ আমাদের বোলিং ইউনিট খুব ভালো করেছে। টসে হেরে যেরকম শুরুরা চেয়েছিলাম, বোলারদের কাছ থেকে সেটা পেয়েছি। আমরা ফিল্ডিং বাজে করায় ওদের ১৭০-১৮০ তে বাঁধতে পারিনি। তারপরো ডাচ বোলিংয়ের বিপক্ষে ২৩০ রানের লক্ষ্য আমাদের ছোঁয়া উচিত ছিল। মোটা দাগে এখন পর্যন্ত আমরা বিশ্বকাপে ভালো খেলতে পারিনি।
বাংলাদেশের সেমির আশা শেষ, দল কীভাবে ঘুড়ে দাঁড়াবে
সাকিব: সত্যি বললে এখান থেকে ঘুঁড়ে দাঁড়ানো ভীষন কঠিন। তারপরো যেহেতু তিন ম্যাচ আছে, খুবই কঠিন, তবুও আমাদের চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা ছাড়া তো কিছু করার নেই। আজকের দিনটা যদি আমরা ভুলে যেতে পারি এবং সামনের ম্যাচটায় ফোকাস করতে পারি ভালো হয়। তবে সেটা অনেক কঠিন। যে পরিস্থিতির মধ্যে আমরা আছি, সেখান থেকে কামব্যাক করা কঠিন।
নিজেকে নিয়ে বিতর্ক, দলের হারে বাংলাদেশী সমর্থকরাও উল্লাস করেছে--
সাকিব: অবশ্যই হতাশার। তারা আসলে সবসময় ভালো কিছুর আশা করে। স্বাভাবিকভাবে সেরকমটা না হলেও তাদেরও অধিকার আছে কথা বলার। তাদের নিয়ে আমার কোন অভিযোগ নেই। আমরা যেভাবে খেলেছি, তাদের কাছ থেকে এটা আমরা প্রাপ্য।
বাংলাদেশের খেলায় আগের ছন্দটা নেই কেন?
সাকিব: এই কেনোর উত্তরটা দিতে পারলে আমরা হয়তো আরও ভালো করতাম। এই কেনোর উত্তরটা এখন আমার কাছে নেই।
আগের চারটি বিশ্বকাপের কোনটাকেই আপনার কাছে আহামরি মনে হয়নি দলের পারফরম্যান্স। এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপকে স্মরণকালে বাজে বিশ্বকাপ মানছেন?
সাকিব: আপনি এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। আমি আপনার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করবো না।
বিশ্বকাপের আগে আপনি বলেছিলেন অধিনায়কত্ব নেয়ার সেটা সঠিক সময় নয়। দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে কী ঘাটতি ছিল?
সাকিব: হ্যা, আমরা অনেক আন্ডার প্রিপেয়ার্ড ছিলাম। কিন্তু এখন আসলে এসব অযুহাত দিয়ে খুব বেশি লাভ হবে না। তবে অবশ্যই আমাদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল।
২৪ বছর হয়ে গেলো, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ সেমিতে খেলতে পারেনি। কোথায় আসলে ঘাটতি, কোথায় কাজ করতে হবে?
সাকিব: আমার তো মনে হয় ভুল মানুষকে এই প্রশ্নটা করেছেন। আমাদের দিক থেকে যদি বলি, অনেক কিছু পরিবর্তন করলে হয়তো বদলটা আসবে, তবে এখন এটা নিয়ে কথা বলার সঠিক সময় না। আমরা এখন পর্যন্ত ২০ বছরে সেমিফাইনাল খেলতে পারিনি, এটা হতাশার। দেশের মানুষ যেভাবে ক্রিকেট পছন্দ করে, আমাদের অনুসরণ করে, এ কারণেই আমাদের আরো ভালো করা উচিত ছিল।
বাংলাদেশ ৩/৫ বছর ধরে ওয়ানডেতে ভালো করছিল। সুপার লিগে ৩ নম্বর দল ছিল। তাতে যে আত্মবিশ্বাস তৈরী হয়েছিল, সেটা কেন বিশ্বকাপে থাকলো না?
সাকিব: একটা জয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। শেষ কয়েকটি সিরিজে ওয়ানডেতে আমরা ভালো খেলছিলাম না। হোমে আফগানিস্তান, ইংল্যান্ডের কাছে হেরেছি। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে দুইটা সিরিজ জিতেছি। আমার মনে হয়ে আমরা ওরকম কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আসিনি, যেটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ করার হতো। এশিয়া কাপে ভালো পারফর্ম করতে পারিনি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা বাদ দিলে। বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের ম্যাচটা বাদ দিলে আমরা খুবই আন্ডার-পারফর্ম করেছি। এতটা খারাপ দল কোনভাবেই বিশ্বাস করি না, আমরা না। হতে পারে বিশ্বকাপ, আবহ, সবার ওপর প্রত্যাশার চাপ। অনেক কিছুই হতে পারে। এগুলে খুঁজে বের করা জরুরী।
সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি বলতে কী বুঝিয়েছেন?
সাকিব: আমি সেমিফাইনালের সম্ভাবনার কথা বলছি না। বলেছি নিদেনপক্ষে আরো একটু ভালো করার, সেটা আটের মধ্যে থাকতে হবে যদি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে হয়। আমাদের তিনটি ম্যাচ আছে। তবে এরকম পরিস্থিতিতে ঘুড়ে দাঁড়ানো কঠিন। আমাদের এই ১৫ জনকেই চেষ্টা করতে পারি যাতে এই পরিস্থিতিটা একটু হলে বদলাতে পারি। আবারও বলছি এটা কঠিন। তবে চেষ্টা করা ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই।
মাহমুদুল্লাহ ছয়ে নেমে গত ম্যাচে সেঞ্চুরি করলেন, আজকে আবার তাকে সাতে নামানো হলো কেন? দলের ব্যাটিং অর্ডারে এত পরিবর্তনের কারণ কী?
সাকিব: আমাদের দলটা আসলে এমন একটা দল, যাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আপনি যদি ব্যাটিং বলেন, বোলিং বলেন, বিভিন্ন সময় আমরা বোলিং করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, বিভিন্ন পজিশনে আমরা ব্যাটিং করতে পছন্দ করি না। বিভিন্ন বোলারকে আমরা ফেস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। আমাদেরকে অনেক কিছু মানিয়ে নিয়ে চলতে হয়। তাই অনেক পরিবর্তন করতে হয়। আমি আশা করি সবাই যার যার জায়গায় যাবে, ও পারফর্ম করবে। আসলে সবাই যার যার পারফর্ম করতে পারতো তবে এগুলো সমস্যা হতো না। দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচের আগের দিন বলেছিলাম, আমরা যদি উপরের দিকে ভালো ব্যাটিং করতে পারতাম, তবে রিয়াদ ভাই, মুশফিক ভাইদের আসল রোলটা ছিল, যেটা চিন্তা করে বিশ্বকাপে এসেছিলাম, সেটা একেবারের সঠিকভাবে কাজ করতো। রিয়াদ ভাই যেই ফর্মে আছে, আমাদের জন্য অনেক ভালো হতো। তবে আমি আপনার দ্বিমত করছি না। রিয়াদ ভাই যেভাবে ব্যাটিং করছে, উনি হয়তো উপরের দিকে আসলে আমাদের দলের জন্য হয়তো ভালো হতো। তবে রিয়াদ ভাইকে বাদ দিলে মুশফিক ভাই ভালো ব্যাটিং করেছেন। বাকীরা আমরা পারিনি।
নির্বাচকদের অদূরদর্শীতাই কী ব্যার্থতার কারণ-
সাকিব: দেখুন কাউকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। আমরা যে ১৫ জনই আছি, এরচেয়ে ভালো আমাদের দল। তবে আমরা কিছুই করতে পারিনি। পারফরম্যান্স সে জায়গা থেকে খুবই হতাশার। ড্রেসিং রুমের সবাই স্বীকার করবে যে আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছুই করতে পারিনি।
তামিমকে নিয়ে যে বিতর্কিত বিশ্বকাপের আগে হলো। স্বাভাবিকভাবেই দলে তার কিছু অনুসারী আছে। এই বিতর্কটা দলের খেলায় প্রভাব ফেলেছে?
সাকিব: ফেলতেই পারে, অস্বাভাবিক কিছু না। কার মনের ভেতর কী আছে, তা বোঝা মুশকিল। আপনি যেটা বলছেন আমি ভিন্নমত পোষণ করি না। প্রভাব ফেলতেই পারে।
গত ছয় মাসে অনেক খেলোয়াড়কে দেখা হয়েছে। তবে বিশ্বকাপ দলে সেই প্রতিফলন ছিলো না...
সাকিব: দেখুন স্বাভাবিকভাবেই আপনার যখন পাঁচ-ছয়মাস আগে কোচ পরিবর্তন হয়, বিশ্বকাপের একটা টুর্নামেন্ট আগে অধিনায়ক পরিবর্তন হয়, স্বাভাবিকভাবে সবকিছুই পরিবর্তন হবে, খুবই স্বাভাবিক। খুবই কঠিণ যে আগের পরিকল্পনাটাই থাকবে। এখন পরিকল্পনা ভালো হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। একেকটা মানুষের পরিকল্পনা একেকরকম থাকবে। একেক জনের দৃষ্টিভঙ্গী একেক রকম হয়। কোন সঠিক, কোনটা বেঠিক, সেটা রেজাল্টের পরেই বোঝা যায়। তবে এটা বলা কঠিন কেন সেই ধারার প্রতিফলনটা থাকলো না।
পাকিস্তানের সঙ্গে পরের ম্যাচ প্রসঙ্গে-
সাকিব: আসলে এখন আমাদের নিজেদের জাগিয়ে তুলতে হবে। এই মুহূর্তে প্রতিপক্ষ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার অবস্থায় আমরা নেই। আমরা যেমনটা খেলতে পারি, সেরকমটাই খেলার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া কোন বিকল্প নেই। তিনটি ম্যাচ আছে। আমাদের এগুলো খেলতে হবে। দেশের মানুষের জন্য কিছু অন্তত নিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়, সেটাই এখন ভাবনায় আছে।