ইতিহাসের শিক্ষা বলে ক্রমাগত শক্তিপ্রয়োগ করে ইসরায়েল তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না। ইসরায়েলিরা নিজেদের ঐতিহাসিকভাবে বাস্তুচ্যুত দাবি করে, তবে তারাই আবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসা নিজেদের ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ করে চলছে। ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনি উপনিবেশ ছেড়ে যাওয়ার পর ইসরায়েলিদের মধ্যে ফিলিস্তিনি অঞ্চল জবরদখলের অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারপরও তারা বারবার শক্তিপ্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে মূলত বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর প্রশ্রয়ে।
শক্তিপ্রয়োগের এই প্রবণতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বেশ সফল হয়েছে। ইতিহাস বলে ইসরায়েল যখনই কোনো আক্রমণ বা প্রতিআক্রমণের শিকার হয়েছে পরক্ষণেই ততোধিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রতিপক্ষের ওপর, তাদের নিঃশেষ ও ধ্বংস করতে চেয়েছে। তবে ইসরায়েলের সেই প্রচেষ্টা কখনো সফল হয়নি বরং উল্টো ক্ষোভ দানা বেঁধেছে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
ইসরায়েলিরা যেমন হাজার বছর ধরে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে ফিলিস্তিনিরাও তেমনি তার জীবনীশক্তিকে বিশ্বের সমানে দেখিয়েছে, ‘জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। তবে ইসরায়েলের এই ‘সম্প্রসারণশীল সাম্রাজ্যবাদিতা’ মাঝে মাঝেই হোঁচট খেয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে ফিরে এসেছে। ইসরায়েলকে আজ যারা অকুণ্ঠ সমর্থন দিচ্ছে তারা যেন ইসরায়েলের সেই নিরাপত্তা ঝুঁকিই তৈরি করছে এবং ইসরায়েলকে সমস্যা সমাধানে সমঝোতার পথে না গিয়ে আগ্রাসী ভূমিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করছে।
ইসরায়েলের এই আগ্রাসী চরিত্র পৃথিবীর ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কাঠামোকে যেমন মনে করিয়ে দিচ্ছে একই সঙ্গে মানবতা ও মানবাধিকারের ধারণাকে ক্রমাগতভাবে ক্ষয়িষ্ণু করে দিচ্ছে। ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ যে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তার দৃষ্টান্ত দুনিয়া চোখ বুজে দেখছে কৌশলগত অবস্থান থেকে। তবে ইসরায়েলের এই আচরণ প্রসঙ্গে এই সময়ে তিনজন মানুষের প্রতিক্রিয়া ক্ষীণ হলেও ন্যায্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন জশ পল যিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে কাজ করতেন। হামাসের আক্রমণের পর যে প্রক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে তার প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেছেন। তার মতে অতীতের মতো তিনি কোনোভাবেই গাজায় বেসামরিক জনগণের হত্যার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না।
তিনি বলেছেন অস্ত্র সরবরাহের তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মার্কিন অস্ত্র মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহার না করার বাইডেন প্রশাসনের নীতি লঙ্ঘন করা হয়েছে। এই অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে তিনি নিজ বিভাগের অভ্যন্তরে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার প্রতি কোনো ধরনের কর্ণপাত করা হয়নি, তাই পদত্যাগই ছিল একমাত্র উপায়। তার মতে অসলো চুক্তির পর নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রতি বছর শত শত কোটি ডলারের সামরিক সহযোগিতা প্রদান করে, আবার এই অসলো চুক্তিতেই ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা আবারও গুরুত্বের সঙ্গে বলেছে। জশ পল বলেছেন মার্কিন সামরিক সহায়তার মাধ্যমে অসলো চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরঞ্চ এই অস্ত্র দিয়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূমি জবরদখল করছে।
তবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বড় বোমাটি ফাটিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তার মতে ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামাসের আক্রমণ জঘন্য কাজ কিন্তু এজন্য ইসরায়েল দায় এড়াতে পারে না। ৫৬ বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা যেভাবে দখলদারিত্বের মধ্যে বসবাস করছে তাকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। তার ভাষায় ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ ‘শূন্য থেকে’ হয়নি। তার এই কথায় স্পষ্ট হয় যে, হামাস ও ইসরায়েলের সংঘাতের একটি প্রেক্ষিত আছে। যাতে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রতিনিয়ত নানা ধরনের জবরদখল চাপিয়ে দিয়েছে। গুতেরেস গাজায় ইসরায়েলের আচরণকে মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন এবং ইসরায়েলও যে মানবিক আইনের ঊর্ধ্বে না, তারই পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
আর সবশেষ যার কথা বলব, তিনি হচ্ছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই প্রথম যিনি এভাবে ইসরায়েল ও হামাসের সংঘাতকে বিশ্লেষণ করতে পারলেন। তার মতে নিজেদের জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার অধিকার ইসরায়েলের আছে। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট বাইডেন হামাস ধ্বংসের অভিযানে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন কিন্তু এখানেই শেষ। বারাক ওবামা বলেন, মানুষের জীবনের মূল্য আছে এবং যেকোনো বিবেচনায় সেই মূল্যবোধকে ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি এই মূল্যবোধকেই ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য সহায়ক বলেছেন।
বেসামরিক জীবনকে তোয়াক্কা না করে হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার অভিযান দীর্ঘমেয়াদি ফল নিয়ে আসতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, হামাসকে ধ্বংস করার অভিযানে লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়া, শিশুহত্যা ও বিভিন্ন ধরনের মানবিক সংকটের কারণে ফিলিস্তিনিরা আরও কঠোর হবে, ইসরায়েলের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন কমবে, ইসরায়েলের শত্রুরা আরও শক্তিশালী হবে, মোটের ওপর শান্তি অর্জনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। সবশেষে, যারা বিভিন্নভাবে সাধারণ মানুষের হত্যাকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন তাদের তিনি নৈতিকভাবে দেউলিয়া বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন ‘ইহুদি বিদ্বেষী’ না হয়েও ইসরায়েল গাজা ও পশ্চিম তীরে যা করছে তার বিরোধিতা করা সম্ভব।
এর উল্টো প্রবণতাও আছে, বিশেষ করে ইসরায়েলি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ ও সশস্ত্র সংগ্রামের দোহাই নিয়ে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি অপকর্ম লুকাতে চান। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের সংকটে প্রগতিশীলতার খোলস ভেঙে পড়ে সহজেই। আসলে ফিলিস্তিনিদের ওপর দখলদারিত্বের সুবিধাভোগী তারাও, একদিকে তারা দখলদারিত্বের সুবিধা নেবেন অন্যদিকে নিজেদের বুদ্ধিজীবী পরিচয়ে বাহবা কুড়াবেন কিন্তু সিস্টেম বদলাতে চাইবেন না। তেমনি ইসরায়েলের ওপর হামাসের আক্রমণের পর ইউরোপীয় বামপন্থিদের প্রতিক্রিয়ার জবাবে ৯০ জন ইসরায়েলি শিক্ষাবিদ, লেখক ও শান্তিকর্মী একটি বিবৃতি দিয়েছেন এর মধ্যে ইসরায়েলি জনপ্রিয় লেখক ও গবেষক যুভাল নোয়া হারিরিও আছেন।
হারিরি সম্প্রতি নেতানিয়াহুবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিয়েছেন। হারিরি বলেছেন, হামাসের আক্রমণের পর তিনি তার দেশের শান্তিকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন যারা নাকি ‘সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত’ ছিল এবং শান্তির প্রচেষ্টায় নিজেদের ‘সম্ভাব্য মিত্রদের কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার ও পরিত্যক্ত’ বোধ করছেন। কিন্তু গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তাদের বিবৃতিতে শান্তির পক্ষে কথা বলার থেকে হামাসের সমালোচনা ও ইসরায়েলকে সমর্থন না করাকে অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হারিরি এই প্রসঙ্গে ইউরোপীয় বামপন্থিদের স্ট্যালিনের প্রতি সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তাদের আক্রমণ করতে চেয়েছেন। তার মতে ‘সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের ধারণা’ ভ্রান্ত এবং তা সম্ভব না।
মূলত শান্তি ও দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা বললেও হারারির মতো বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের জায়গা ছাড়তে রাজি না, আদতে তারা তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কৌশলে ইসরায়েলিদের সহনশীলতা ও শান্তিকামিতার ছদ্মাবরণ বহির্বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন যদিও তারা ইসরায়েল রাষ্ট্রের কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছেন না। তার থেকে আরও বেশি গুরুতর যখন তিনি বলেছেন ‘ফিলিস্তিনিদের অবস্থা ভয়ংকর কিন্তু অন্তত এটা পরিষ্কার যে ইসরায়েল এত বেসামরিক লোকজনকে হত্যা করতে চায়নি, যেটা সিরিয়ায় আলেপ্পো ও হোমসে আসাদ করেছেন। সমস্যার একমাত্র সমাধান হতে পারে হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো একটি বিকল্প ভবিষ্যৎ তৈরি করা।’ এই লাইনটা থেকে খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় শান্তির খোঁজে হারিরির দর্শনগত ভিত্তিটা কী? এবং সেই দর্শনে যে ফিলিস্তিনিরা স্বাধীন অবস্থান ও সমমর্যাদায় নেই তা বলাই এখানে বাহুল্য।
ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলের শান্তির একমাত্র পথ দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র কাঠামোর অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া এবং একে অপরকে স্বীকৃতি দেওয়া। ইসরায়েলিরা এই অঞ্চলে তাদের ভাষায় ‘ফেরার’ আগ পর্যন্ত এই ভূমিতে ফিলিস্তিনিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করে আসছে। ইসরায়েলি পূর্বপুরুষদের তাদের কথিত বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনায় উত্তর প্রজন্মের ফিলিস্তিনিদের কোনো দায় নেই। অধিকন্তু সমাধান ও শান্তির নামে ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েল ও তার মিত্রদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও শাস্তির শিকার হয়ে আসছে।
ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েল ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত না মেনেছে ইসরায়েল না তাদের মিত্ররা। জাতিসংঘ ১৯৪৭ সালের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ব্রিটিশদের ফিলিস্তিনি ভূমি ত্যাগের পর ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের সহ-অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য এই দুটি জাতির জন্য আলাদা দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র কাঠামোর ঘোষণা প্রস্তাবনা গ্রহণ করে তা এতদিনেও বাস্তবায়ন করা যায়নি মূলত এসব প্রবঞ্চনার কারণে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com