ক্ষতি এড়াতে বছরে লাগবে ১২.৫ বিলিয়ন ডলার

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এড়াতে বাংলাদেশের বছরে সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নানের মতে, বিপুল অঙ্কের এ বিনিয়োগ সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের এগিয়ে আসতে হবে।

গত কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মানুষকে জলবায়ু সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে। যারাই দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে তাদের নিজেদের উত্তরণের জন্য অনেক সময় নিতে হয়েছে। এখন স্বল্প সময়ের উত্তরণের পর দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন সবুজ প্রযুক্তি। বিশ^ব্যাংক এ প্রযুক্তি কে উৎসাহ দেয় এ জন্য যে এতে উচ্চ উৎপাদনশীলতা আসে। তাই এ ধরনের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংক ও ব্রাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) আয়োজিত ‘টুওয়ার্ড ফাস্টার, ক্লিনার গ্রোথ ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক কনফারেন্সে এসব আলোচনা হয়। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ^ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুলায়ে সেক। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, কেবল ঘূর্ণিঝড়ের কারণেই বছরে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি ডলার। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ঘরছাড়া হতে পারে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ।

আবদুলায়ে সেক বলেন, দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অঞ্চলের দেশগুলো কোনোভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি এড়াতে পারবে না। এ ধরনের দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিব মানুষ। এ অঞ্চল একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় বাজারও। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্প কারখানাগুলোতে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশকে অবশ্যই পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আরও অনেক কিছু করতে হবে। সবুজ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যেও জনগণকে দারিদ্র্য কমাতে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করছি। এ জন্য দেশে এ সংক্রান্ত আরও প্রকল্প আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। জলবায়ু মোকাবিলায় নানান পরিকল্পনা ও কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য আরও আগ্রহী আমরা। এ জন্য ইতিমধ্যে ডেল্টা প্ল্যান, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। আমাদের বিশেষজ্ঞরা নানানভাবে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আমরা একসঙ্গে কাজ করছি। তাদের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে কাজ হচ্ছে। আমরা জলবায়ু রক্ষার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুৎসহ পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে মনোযোগ দিয়েছি। এখানে এখন বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলার অংশ হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনায় এডিবি, বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানান পরিকল্পনা মন্ত্রী।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ধীর গতির প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক সংকটে সীমাবদ্ধ কয়েকটি দেশ। এ দেশগুলোর অর্থনীতিকে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবর্তনের সঙ্গে মানানসই করতে আর্থিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবর্তনের সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বায়ু দূষণ হ্রাস এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ রয়েছে। এমনকি সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেও দেশগুলো বাজার-ভিত্তিক নীতি, তথ্য প্রচার, অর্থের সংস্থান এবং নির্ভরযোগ্য পাওয়ার গ্রিডের ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও শক্তি-দক্ষ প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জ্বালানির উত্তরণ দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারকে নতুন আকার দেবে। এই অঞ্চলের প্রায় ১০ শতাংশ শ্রমিক দূষণের মধ্যেই কর্মক্ষেত্রে কাজ করেন। অদক্ষ এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের মধ্যেই এ দূষণ প্রভাব ফেলে। প্রতিবেদনে এই ধরনের কর্মীদের সুরক্ষার জন্য বিস্তৃত নীতির সুপারিশ করা হয়েছে।