নতুন রেস্টুরেন্ট ক্লাউড কিচেন

ঘরে বা অফিসে বসে খাবার আনিয়ে খাওয়ার চল করোনাকাল থেকেই বেড়েছে। এর ফলে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার ধরনও বদলে যাচ্ছে। অনেক রেস্টুরেন্ট আছে যাদের শুধু রান্নাঘর আর স্টোররুম। কর্মচারী হলো শেফ ও সহকারী। চেয়ার-টেবিলে বসে খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। খাবারের অর্ডার আসে অনলাইনে। গ্রাহকের কাছে খাবার পৌঁছে দেয় বিভিন্ন অ্যাপের ফুড অ্যাগ্রিগেটররা। এ ধরনের ব্যবসায় খুব বেশি মূলধনের প্রয়োজন হয় না। নতুন এই রেস্টুরেন্টের নাম ‘ক্লাউড কিচেন’। এই ব্যবসা কীভাবে করবেন জানালেন সাজিদ ইমতিয়াজ

কোনো ব্যবসা শুরু করতে বড় অঙ্কের মুলধনের প্রয়োজন হয়। মূলধনের পাশাপাশি ঝুঁকিও নিতে হয়। ব্যবসা লাভজনক হবে তো। কিন্তু ক্লাউড কিচেন খুব কম টাকায় ব্যবসা শুরু করা যায়। নিজে ভালো রান্না জানলে কাজটা সহজ হয়ে যায়। প্রয়োজন হয় ভালো মানের রান্নাঘর। খুব বেশি জায়গারও প্রয়োজন হয় না।

একটা ভালো মানের রেস্টুরেন্ট করতে যেমন ভালো জায়গা, আকর্ষণীয় ইন্টেরিয়র ডিজাইন, অনেক রকমের ক্রোকারিজ, লোকবলসহ  নানা কিছুর জন্য প্রচুর খরচ হয়। আর ক্লাউড কিচেন করলে এ খরচের পুরোটাই বেঁচে যায়। তাছাড়া খাবার পরিবেশন, পরিষ্কার করার ঝামেলা নেই। যার ফলে অতিরিক্ত লোকবল ও বেতন-ভাতার খরচ হয় না। খরচ অনেকটাই কম হয়। কোনো কোনো ক্লাউড কিচেন রেস্টুরেন্টের নিজস্ব ডেলিভারি ব্যবস্থা থাকে। কেউ কেউ ফুডপান্ডা, পাঠাও ফুড, উবার ইটস-এর মতো ফুড অ্যাগ্রিগেটরও দায়িত্ব নেয়।

পরিকল্পনা

ব্যবসা শুরুর আগেই পুরো পরিকল্পনা করে নিতে হবে। ব্যবসায় পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকলে ছোট আকারে শুরু করাই ভালো। ব্যবসা শুরুতে যেসব পরিকল্পনা করে নিতে হবে

খাবার নির্বাচন ও বিক্রি : ব্যবসার শুরুতেই ঠিক করে নিতে হবে আপনি কোন ধরনের রান্নায় পারদর্শী। কোন ধরনের খাবার বিক্রি করতে চান। সে ধরনের খাবারের আশপাশে চাহিদা আছে কিনা। বিশেষ করে বিভিন্ন করপোরেট অফিস, কমিউনিটিতে কোন ধরনের খাবার বেশি অর্ডার করা হয় খোঁজ নিয়ে দেখুন। এরপর সিদ্ধান্ত নিন শুধু ফাস্টফুড, নাকি চাইনিজ, থাই, ইতালিয়ান বা ভারতীয়। ঠিক কোন বেলার এবং ধরনের খাবার আপনার রেস্টুরেন্টে বিক্রি হবে। শুরুতেই অনেকগুলো মেন্যু না করে একটি বা দুটি খাবার বেছে নিন। প্রাথমিক মেন্যু ও মূল্য ঠিক করে নিন। পরে গ্রাহকদের চাহিদা বুঝে মেন্যুতে নতুন খাবার যোগ-বিয়োগ করতে পারেন। এছাড়া আপনি কোন এলাকায় খাবার ব্যবসা করতে চান তার ওপর মেন্যু এবং দাম ঠিক করুন। অফিস বা আবাসিক এলাকায় মেন্যুর ধরন ও দাম আলাদা আলাদা হবে। এই বিষয়টাও বিবেচনায় রাখুন।

স্থান : রান্নাঘর  আপনার বাড়িতে হবে নাকি ভাড়া নেবেন সেটা ঠিক করা যেমন জরুরি আপনার খাবারের যারা ক্রেতা তাদের কাছাকাছি হওয়াও যুক্তিযুক্ত। যাতে সহজে ও দ্রুত সরবরাহ করা যায়। কিচেনটি যেন পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর হয় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ খাবারের মানই ব্যবসার সুনাম ও পরিধি বাড়াবে। ব্যবসার জন্য অল্প খরচে ভালো জায়গা নির্বাচন করার চেষ্টা করুন।

কাগজপত্র : ক্লাউড কিচেন করতে ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, স্যানিটারি লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, বিএসটিআই সনদ, প্রেমিসেস লাইসেন্স, কারখানা সনদ, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন এবং রেস্তোরাঁ পরিচালনার লাইসেন্সের প্রয়োজন হবে।

অর্ডার নেওয়ার ব্যবস্থা : খাবারে অর্ডার নিতে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। আবার ডেলিভারি অ্যাপ-এর মাধ্যমে অর্ডার দিলে কমিশন দিতে হয়। নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং অ্যাপ-এর মাধ্যমেও অর্ডার নিতে পারেন। যেখানে গ্রাহক সরাসরি অর্ডার করবেন। আবার ফুড অ্যাগ্রিগেটররাও অর্ডার করতে পারেন। সেই সঙ্গে অনলাইন অর্থ পরিশোধের জন্য ভালো মানের পয়েন্ট অব সেল সিস্টেম থাকা জরুরি। তবে নিজেরা অর্ডার নেওয়া ও সরবরাহের দায়িত্ব নিলে কাজের পরিধি বাড়ে। তাই শুরুতে ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করলেই ভালো।

রান্নাঘর ও প্যাকেজিং : রান্নাঘরের জন্য শুরুতেই চিমনি, ফ্রিজার এবং গ্যাসের চুলা , ওভেন এসবের দরকার হবে। তাই এসব গ্যাজেটগুলো ভালো মানের কেনার চেষ্টা করুন। যাতে অনেকদিন ব্যবহার করা যায়। বাজার সদাই পাইকারি বাজার থেকে কেনার চেষ্টা করুন দামে সাশ্রয় হবে। খাবার প্যাকেজিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাতে খাবার নষ্ট না হয় ও গরম থাকে। আবার দেখতে ভালো হলে ক্রেতার আগ্রহও তৈরি হবে।

দক্ষ শেফ ও সহকারী : খাবারের মানের ওপরই রেস্টুরেন্টের সুনাম ও ব্যবসা নির্ভর করবে। তাই ভালো শেফ, সহকারী ও পরিচ্ছন্নকর্মী থাকলে কিচেন ভালোভাবে পরিচালনা করা যাবে। ফোনকল রিসিভ ও ক্রেতার সঙ্গে আন্তরিক কথোপকথনের আগ্রহ থাকতে হবে।

ডেলিভারি : প্রতিটি অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি দেওয়া নিশ্চিত করা জরুরি। একজনের অর্ডার যেন কোনোভাবেই আরেকজনের কাছে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা। কোনো কারণে ভুল হয়ে গেলে অবশ্যই দ্বিধাহীনভাবে দুঃখ প্রকাশ করে গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এরফলে রেস্টুরেন্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

প্রচারণা : রেস্টুরেন্ট ব্যবসার মূলমন্ত্র মানসম্পন্ন খাবার ও প্রচারণা। যেহেতু ক্লাউড কিচেন অনলাইন ব্যবসা। সেহেতু ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। প্রয়োজনে ইউটিউবে চ্যানেল খুলে প্রচারণা চালাতে পারেন। পাশাপাশি সেখান থেকেও আয় করার সুযোগ আছে। খাবার মেন্যু দিয়ে ফেসবুকে বুস্ট করুন। দ্রুত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন খাবারের ছবি ও রেসিপি তুলে ধরতে পারেন। রেস্টুরেন্টে নতুন নতুন অফার চালু রাখুন। রেস্টুরেন্টের রিভিউ এবং খাবারের ছবি শেয়ার করার জন্য ক্রেতাকে উৎসাহ তিন। মাঝে মধ্যে বিশেষ উপলক্ষে ছাড়ের ব্যবস্থা রাখতে পারেন। রিভিউ ও শেয়ারের জন্য এ ধরনের ছাড়ের অফার থাকতে পারে। বেশি সংখ্যক ফুড ডেলিভারি অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারলে ভালো। এতে অনলাইনে আপনার উপস্থিতি বাড়বে। ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে গুগল ম্যাপে কিচেনের অবস্থান দেখিয়ে দিন। গ্রাহক যত সহজে অনলাইনে খুঁজে পাবে তত বেশি অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।