পিঁপড়ায় ধরেছে দেশের ক্রিকেট

সময়ের হিসাবে ২০ বছর। অনেকেই বলে থাকেন ‘অভিশপ্ত ২০০৩’। আমি ওরকমটা বলি না। তবে সে বছর ওয়ানডে বিশ^কাপটা যে আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণকালের বাজে টুর্নামেন্ট ছিল তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল কেনিয়া ও কানাডাকে হারানো। কিন্তু জিততে পারিনি। আজ দুই দশক পর যখন আরও একটি আসরে খেলতে গেছে বাংলাদেশ, তখনো হারের বৃত্তে বন্দি। তাই ২০ বছর আগের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। কিন্তু আমি সেই দল আর এই দলের কোনো তুলনায় যাব না।

যদিও বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান সেদিন ম্যাচ শেষে বলেছে, এটাই স্মরণকালের বাজে আসর। কিন্তু এটা আসলে সে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে এবং সে নিজে অপরাধবোধ করছে বলেই বলেছে। ঠিক একইভাবে ২০০৩ সালে অধিনায়ক ছিলাম আমি। আমার কাছে এখনো মনে হয় সেটাই সবচেয়ে বাজে। কারণ আমরা কোনো ম্যাচই জিততে পারিনি। এবারের আসরে বাংলাদেশ তবুও তো জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে।

আমার সময়টা খুব বাজে ছিল। কারণ তখন পিঠে কেউ হাত দিয়ে বলেনি, যা হয়েছে তা ভুলে সামনে এগিয়ে যাও। আমরা তোমাদের পাশে আছি। এই দলটা তো বিসিবি সভাপতিকে পাশে পাচ্ছে। কিন্তু এখানে তুলনা করার কোনো কিছু নেই। দুইটার সময় দুই রকম। আলোচনায় আসতেই পারে, তখন সুযোগ-সুবিধা কম ছিল। এখন তো বেড়েছে।

হ্যাঁ, তা ঠিক। তখন মাত্র দুজন বিদেশি কোচ ছিলেন। তারাও ছিলেন উপমহাদেশীয়, তাদের বেতন মাসে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার বেশি ছিল না। এখন তো সব কোচই বিদেশি। তাদের পেছনে মাসে খরচ প্রায় ২ কোটি টাকা। তাহলে কেন এমন ফলাফল? যেখানে দেশি কোচরা পান ১ লাখ টাকা, সেখানে ভিনদেশিরা ৩০-৩৫ লাখ টাকা নিয়ে যান। সেখানে দর্শকরা তো ম্যাজিক আশা করবেনই।

বাংলাদেশের এবারের বিশ্বকাপ ভালো যাচ্ছে না। কারণ ব্যাটসম্যানরা রান পাচ্ছে না। ছয়ে নেমে সেঞ্চুরি করা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে পরের ম্যাচে আবার সাতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেহেদী হাসান মিরাজকে তিনে নামানো হয়েছে, সে রানও করেছে। কিন্তু এই অবদান তো সাতে নেমেও করার সামর্থ্য রাখে। এই প্রমাণ তো সে গত ডিসেম্বরে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলে দেখিয়েছে। রিয়াদকে ওপরে নিয়েই আসা হচ্ছে না। মুশফিককেও নিয়ে আসা হচ্ছে না। ওপেনারও আমাদের হাতে নেই। ফলে ব্যাটসম্যানদের রান না পাওয়াটাই ম্যাচ হারের কারণ হয়ে যাচ্ছে।

২০০৩-২০২৩ আলাদা দুটো সময়। তাই এখানে আমি বারবার বলছি তুলনায় যাচ্ছি না। এর কারণ, দায়টা ক্রিকেটারদের নয়। সমস্যাটা ক্রিকেট অবকাঠামোর। একটি দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির উন্নতি না হলে ক্রিকেটারদের কাছ থেকে ভালো পারফরম্যান্স পাওয়া যাবে না। একটি আপেলকে যদি একটু খেয়ে টেবিলে রাখেন আপনি, তাহলে পিঁপড়া ছুটে আসবে। তখন আপনি সরিয়ে রাখলে সেটা থেকে বাঁচাতে, কিন্তু যেখানে রেখেছেন, সেখানেও পিঁপড়া এসে যাবে।

দেশের ক্রিকেটকেও এমন কিছু পিঁপড়ারা ঘিরে ধরেছে। এসব পিঁপড়া সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। যেখানে সরিয়ে নেওয়া হবে, সেখানেই এসে তারা ভর করবে। যে কারণে বহু ‘সমস্যায় জর্জরিত’ দেশের ক্রিকেট। এটা একদিনে তৈরি হয়নি। অনেক দিনের ভুলের মাশুল। সেই ভুলগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা বা জবাবদিহিও নেই। তাই সহজে এর কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনেও হয় না।