যে বয়স মুক্ত বিহঙ্গের মতো ছুটে চলার, পৃথিবীকে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করার, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার—সে সময় ফুল বিক্রি করা কামরুল স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে বড় চাকরি করে বাবাকে রিকশা চালাতে দেবে না; বোনকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তুলবে।
মানবজীবন বড়ই বৈচিত্র্যপূর্ণ; জীবনে কখন কিসের মোকাবিলা করতে হয় জানে না কেউই। জীবন চাকা সচল রাখতে মানুষকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পেশার কাজ করতে হয়। কেউ শিশু, কেউ কিশোর, কেউ যুবক কিংবা কেউ প্রাপ্তবয়স্ক থেকে জীবনের তাগিদে ছুটে চলে কাজের সন্ধানে। দারিদ্র্যের কাছে হার মানে শিশু বয়সের শখ-আহ্লাদ, ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা; মলিন হয় নিজের মৌলিক অধিকারটুকুও। শৈশবেই হাল ধরতে হয় নিজের ও নিজের পরিবারের। ছোট্টোবেলায়ই এসব শিশু দেখে ফেলে পৃথিবীর বাস্তবতা। তেমনি ফুলবিক্রেতা শিশু কামরুল।
বাবা নেই, মা নেই, থাকলেও অসুস্থ কিংবা কেউ তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়নি এসব কারণেই সাধারণত শিশু বয়সে জীবিকার তাগিদে শ্রম দিয়ে থাকে শিশুরা। তবে মা, বাবা থাকার পরও বাসায় অসুস্থ বড় বোনকে মাছ কিনে খাওয়াতে ফুল বিক্রি শুরু করেছে ১০ বছর বয়সী কামরুল হাসান।
রংপুরের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে রিফাত-সিফাতরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফুল, ফুলের মালা বিক্রিতে পুরনো মুখ। নতুনমুখ ১০ বছর বয়সী কামরুল। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাল শাপলা ফুল বিক্রি করতে দেখায় ডাক দিয়ে কাছে নিয়ে জানতে চাইলে কামরুল জানায়, তার বাবা-মা উভয়ই আছে। বাবা রিকশা চালিয়ে সংসার চালায় এবং মা বাড়িতেই থাকে। বাসায় তার বড় বোন অসুস্থ, সে মাছ খেতে পছন্দ করে কিন্তু হরতাল, অবরোধের কারণে বাবা রিকশা নিয়ে শহরে বের হতে ভয় পায়। বোন মাছ খেতে চাওয়ার পরও বাবা কিনে দিতে না পারায় সে ক্যাম্পাসে ফুল বিক্রি করতে আসে এবং বোনের জন্য মাছ কিনে নিয়ে যায় গত কয়েকদিন ধরে।
কামরুল বলে, আমার আপু অসুস্থ হয়ে বাসায় থাকে। কি হয়েছে আমি জানি না, ডাক্তার বলেছে আপু অনেক অসুস্থ। আমি আপুকে মাছ কিনে খাওয়াতে বিকেলবেলা করে ফুল বিক্রি করি। আজকে স্কুলেও যাইনি যেন বেশি টাকা বিক্রি করতে পারি।
সে আরও বলে, আব্বু রিকশা চালায়। তার ইনকামের টাকা দিয়ে তেমন কিছু খাইতে পারি না। দু-তিন দিন হলো আব্বু রিকশা নিয়া বের হতে ভয় পায়। মানুষ নাকি পুড়িয়ে ফেলে। তাই আমি ফুল বেচে আপুর জন্য মাছ নেব।
১০ বছর বয়সী কামরুল রংপুর শহরের লালবাগ কেডিসি মোড়ের পাশে বাবা, মা, বোনের সাথে থাকে। তার বাবার নাম হেলাল। তিনি পেশায় রিকশাচালক। মা গৃহিণী এবং বড় বোন অসুস্থ। সে আনন্দ স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।
কামরুল জানায়, সকালে ঘুম থেকে উঠে তার এলাকার এক ভাইসহ রংপুরের মডার্ন মোড়ের পাশে বিল থেকে এসব শাপলা তুলে এনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, কারমাইকেল কলেজ ও বাণিজ্যমেলার সামনে বিক্রি করা শুরু করে। ১৫০-২৫০ টাকা বিক্রি করতে পারে সে। সেখান থেকে বোনের জন্য মাছ কিনে বাড়িতে যায়।
তার এসব কথা না জেনেই হয়তো 'আপু একটা ফুল নেন, ভাইয়া একটা ফুল নেন' আবদারের জন্যই কেউ কেউ ফুল কিনে থাকে। অনেকে হয়তো ঘুরেও তাকায় না তার দিকে। হয়তো কেউ কেউ ডেকে নিয়ে জানতে চায় কি কারণে ফুল বিক্রি করছে ছোট্ট কামরুল।
যে বয়স মুক্ত বিহঙ্গের মতো ছুটে চলার, পৃথিবীকে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করার, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার—সে সময় ফুল বিক্রি করা কামরুল স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে বড় চাকরি করে বাবাকে রিকশা চালাতে দেবে না; বোনকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তুলবে।