জোরালো হচ্ছে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব

মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের এক শুনানি মঙ্গলবার ভেস্তে গেছে। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ করতে যুদ্ধবিরতির দাবি নিয়ে জড়ো মানুষের বিক্ষোভের জেরে শুনানি ভেস্তে যায়। বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা ইউরোপের বিভিন্ন অংশে ইসরায়েলি বর্বরতার বিরোধিতার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর নেমে আসার গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত আরও জোরালো হওয়ার অংশ হিসেবেই এসব তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। 

ইসরায়েলের জন্য হোয়াইট হাউজের তরফ থেকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে ১০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা মঞ্জুর করার কথা। এতে হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে ইসরায়েলের জন্য ১৪৩ কোটি ডলার বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি সামনে রেখে সিনেটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।

শুনানিতে অ্যান্টনি ব্লিনকেন কথা বলা শুরু করলে হট্টগোল শুরু করেন যুদ্ধবিরতির দাবি জানাতে আসা জনতা। ‘কোডপিংক’ শিরোনামের যুদ্ধবিরোধী একটি সংগঠনের সদস্যরা এই প্রতিবাদে শামিল হন। এ সময় ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তা দেওয়া বন্ধ করারও দাবি জানানো হয়। তাদের শোরগোলের কারণে কয়েকবার শুনানি মুলতবি করতে হয়। ক্যাপিটল পুলিশ তৎপর হয়ে জমায়েত সরিয়ে দেয়। এ সময় কমপক্ষে ১২ জনকে আটক  করা হয়।

প্রতিবাদকারীরা সিনেট ভবনে রক্তরঙে হাত রঞ্জিত করেন এবং তারা ‘গাজার শিশুদের রক্ষা করুন’ শীর্ষক প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস দীর্ঘ। সব সময়ই তারা ইসরায়েলের অস্তিত্বের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে। এই মুহূর্তে গাজায় স্থল অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। হোসপাতাল থেকে শুরু করে আশ্রয়কেন্দ্রও রেহাই পাচ্ছে না।

হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি স্বীকার করেন, ইসরায়েলি বাহিনী বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়া নিয়ে উদ্ভূত প্রশ্নের প্রত্যাশা হয়তো পূরণ করতে পারছে না। তবে ইসরায়েলি প্রশাসন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হ্রাস করতে চেষ্টা করছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনে কাজ করা জেরেমি কনিয়ানড্রিক বর্তমানে ইউএসএইডে কাজ করেন। তিনি মনে করেন, জাবালিয়ার আশ্রয় শিবিরে হামলা স্পষ্টত যুদ্ধাপরাধ।

অর্থাৎ জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন এখন ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি ও গাজায় বেসামরিক প্রাণহানির মধ্যে একটি চূড়ান্ত জটিলতার মধ্যে রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইউরোপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের পশ্চিমা মনোভাবাপন্ন দেশগুলোর সামনেও একই রকম চ্যালেঞ্জ ও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রথম দিকে হামাসের হামলায় এক হাজার ৪০০ ইসরায়েলি হত্যা ও দুই শতাধিক বেসামরিক নাগরিককে জিম্মি করার প্রসঙ্গ তুলে হামাসের সন্ত্রাসবাদী কাজ নিয়ে জনমত গঠন করার চেষ্টা চলেছে। এর ধারাবাহিকতায়, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে চলতি সপ্তাহে ডেনমার্কের কোপেনেহেগেন, ইতালির রোম, সুইডেনের স্টকহোমে বিক্ষোভ হয়েছে। গত শনিবার প্যারিস, মার্শেই শহরে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মানুষ রাস্তায় নামে। নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে স্বাধীন ফিলিস্তিনের দাবিতে বিক্ষোভ হয়। দেশটির আইনসভা অভিমুখে মিছিল করে সংগঠিত জমায়েত।

ইউরোপে সাধারণ মানুষের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো বর্বরতা নিয়ে সহানুভূতি জোরালো হওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি ইউরোপীয় নেতাদের ওপর চাপ তৈরি করেছে। চলতি যুদ্ধ শুরুর দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ফিলিস্তিনিদের জন্য সহায়তা স্থগিত করে। কিন্তু পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি দেখে তারা সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। কিন্তু ইসরায়েল যেভাবে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা আসছে না ইইউ থেকে। 

ইইউ আইনপ্রণেতাসহ জোটসংশ্লিষ্ট ৮০০ জনের মতো ব্যক্তিত্ব সংস্থাটির প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েনের কাছে চিঠি লিখে ‘ইসরায়েলপন্থি’ অবস্থান থেকে সরে আসার আহ্বান জানায়। 

ইইউ ব্লকের বামপন্থি আইনপ্রণেতা মানু পিনেডা বলেন, ভন ডার লিয়েন এবং ইইউ আইনসভার প্রধান রবার্টা মেটসোলা ইসরায়েলের পদক্ষেপের সঙ্গে সহমত।