মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) উত্তরা-মতিঝিল-উত্তরায় চলাচল শুরু করবে আজ। আগামীকাল থেকে যাত্রীরা এ পথে চলাচল করতে পারবে। পুরোদমে এ প্রকল্প চালু হলে যাত্রীদের সময় বাঁচবে, কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং শহরের যানজট কমাবে। এসবের আর্থিক মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশ চালু হওয়ায় যানজট, বায়ূদূষণ কমবে এবং যাত্রীদের সময় বাঁচবে। সময় সাশ্রয়ের ফলে দৈনিক ক্ষতি কমবে ৮ কোটি ৩৮ লাখ, বছরে ৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। আর এ করিডোরে যানবাহন পরিচালনা বাবদ দৈনিক খরচ কমবে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা, বছরে ৪৩০ কোটি টাকা। মেট্রোরেল চালু হওয়ায় বছরে ২ লাখ ২ হাজার ৭৬২ টন কার্বন নিঃসরণ কমবে, যা যানবাহনের জ¦ালানির কারণে এ করিডোরে নিঃসৃত হতো। এর অর্থমূল্য অন্তত ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যাত্রীদের উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে সময় বাঁচবে ৬৫ মিনিট। উত্তরা থেকে মতিঝিলে চলতে এখন সময় লাগে ১০৫ মিনিট আর মেট্রোতে চলতে সময় লাগবে ৪০ মিনিট।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মতিঝিল অংশের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে মেট্রোরেল পূর্ণতা পাচ্ছে। পুরোদমে মেট্রোসেবা চালু হলে দৈনিক প্রায় পাঁচ লাখ লোক যানজটের ধকল ছাড়াই স্বল্প ও নির্দিষ্ট সময়ে চলাচল করতে পারবে। এটা ঢাকার জন্য একটা মাইলফলক। আগারগাঁও অংশে এখন যে পরিমাণ যাত্রী চলাচল করছে মেট্রোরেল মতিঝিল পর্যন্ত চালু হলে তার পাঁচ থেকে ছয়গুণ যাত্রী চলাচল করবে।’
তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশনে একত্রে পাঁচ থেকে ছয় হাজার যাত্রী ওঠানামা করবেন। স্টেশনগুলোর নিচের সড়ক ও ফুটপাত এজন্য দখলমুক্ত করতে হবে ও চলাচলের অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। মেট্রো কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যাতে ঠিকমতো কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাছের খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেট্রোরেল পরিবেশবান্ধব প্রকল্প। এ প্রকল্পের ফলে সময় বাঁচবে, যানবাহন পরিচালনা সহজ হবে ও কার্বন নিঃসরণ কমবে। মেট্রোরেল চালু হলে বছরে ২ লাখ ২ হাজার ৭৬২ টন কার্বন নিঃসরণ কমবে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা।’
তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেল ভালো প্রকল্প; তবে ঢাকার যানজট নিরসন করতে হবে, চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সুপরিসর ফুটপাত লাগবে এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রাজধানীতে সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই মেট্রোরেলের সুবিধা পাওয়া যাবে।’
ঢাকার যানজট নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথম প্রকল্প এমআরটি-৬। উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এ প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার অংশের উদ্বোধন করেন গত বছর ২৮ ডিসেস্বর। শুক্রবার ছাড়া উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করছে। এ অংশে দৈনিক ৮০ হাজার যাত্রী চলাচল করছে।
আগারগাঁও-মতিঝিল অংশও একই নিয়মে চলবে। প্রথমে সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করবে। পরের তিন মাসে ধাপে ধাপে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলাচল করবে। এরপর সময় আরও বাড়বে এবং সপ্তাহের প্রতিদিন চলাচল করবে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ঢাকার যানজট নিরসনে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (এসটিপি) সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর একনেক এমআরটি-৬ প্রকল্প অনুমোদন করে। আর ২০১৩ সালের ৩ জুন ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি (ডিএমটিসিএল) গঠন করা হয়। পাশাপাশি ঢাকা ও আশপাশের পরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ২০০৫ সালের এসটিপি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশোধিত ২০১৫-২০৩৫ মেয়াদের এসটিপিতে ছয়টি মেট্রোরেল প্রকল্প করার কথা বলা হয়েছে। সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক দাঁড়াবে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। এর মধ্যে উড়ালপথে ৬৯ কিলোমিটার ও পাতালপথে ৬১ কিলোমিটার। যানজটে ঢাকার বার্ষিক ক্ষতি ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীবাসীর জীবনে ভিন্নমাত্রা ও গতি যোগ হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে। সময় সাশ্রয়ী যানে চলাচল করবে ৫০ লাখ মানুষ। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুসরণ করে এ যানে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী সব শ্রেণির মানুষের উপযোগী করে তৈরি করা হচ্ছে।