গ্রেপ্তার চ্যালেঞ্জে বিএনপির নেতৃত্ব

মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংসতার পর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একের পর এক গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দ্বিতীয় সারির কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে। ঢাকার বাইরেও দলটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ অবস্থায় আন্দোলনে নেতৃত্ব এবং আন্দোলন সফল হবে কি না, তা নিয়ে একধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তবে বিএনপি এই পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ মনে করছে না। দলটির নেতারা বলেছেন, বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি আছে। ধরপাকড়েও তাদের টলানো যাবে না।

মহাসমাবেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মিডিয়া সেলের আহ্বান জহিরউদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সরোয়ার ছাড়াও ঢাকা মহানগরের আমিনুল ইসলাম ও মিরাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে দলটির নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন।

বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যসংখ্যা তিন শতাধিক। এ ছাড়া রয়েছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যরা। ওই নেতারা বলছেন, প্রথম সারির নেতারা গ্রেপ্তার হলে দ্বিতীয় সারির নেতারা নেতৃত্ব দেবেন। দ্বিতীয় সারির নেতারা গ্রেপ্তার হলে তৃতীয় সারির নেতারা নেতৃত্ব দেবেন। এভাবে চলতে থাকবে যত দিন আন্দোলন চলবে।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া পরীক্ষিত ও জনসাধারণের কাছে পরিচিত জ্যেষ্ঠ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এ ছাড়া জেলাসহ রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এ অবস্থায় কমিটির দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা গ্রেপ্তার হলে কমিটির পরবর্তী নেতারা দায়িত্ব পালন করবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায় বিএনপির মহাসচিব ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মহাসচিব গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের মুখপাত্র হিসেবে কখন, কে দায়িত্ব পালন করবেন বিগত দিনের আন্দোলনে তার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিগত দিনে রিজভী আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে ভারতে অবস্থান করা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ ছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এভাবে কারাগারের বাইরে থাকা নেতাদের যখন যাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

বিচ্ছিন্নভাবে রাজধানীতে ঝটিকা মিছিলে আন্দোলনে সফলতা আসবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সারা দেশে অসংখ্য নেতাকর্মী কারাগারে। বাইরে যারা আছেন, তাদের বাড়িতে প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখলে রেখেছে পুলিশ। এ অবস্থায় নেতারা প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। তারপরও তৃণমূল নেতারা সাধ্যমতো রাজপথে নামছেন।

বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চূড়ান্ত আন্দোলনের শেষ ধাপে আছি আমরা। সময় হলেই সবাই রাজপথে নামবেন।’ 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার বিএনপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে রিজভী বলেন, ‘জ্যেষ্ঠ নেতাদের গ্রেপ্তার করে বিএনপির নেতৃত্বকে দুর্বল করা যাবে না। কারাগারের বাইরে থাকা বিএনপির সর্বশেষ ব্যক্তিটি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন।’

গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো বিএনপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলাল গ্রেপ্তার হওয়ায় জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. মোকাররম হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন্নবী টিটুল গ্রেপ্তার হওয়ায় প্রথম যুগ্ম সম্পাদক মো. ইলিয়াস হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু গ্রেপ্তার হওয়ায় প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজুকে ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক, সদস্য সচিব মাহফুজ উন নবী ডন গ্রেপ্তার হওয়ায় সদস্য মো. আব্দুস সালামকে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব এবং নড়াইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ায় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী সুলতানুজ্জামান সেলিমকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

টানা ৭২ ঘণ্টার অবরোধের দ্বিতীয় দিন বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব ও ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক এবং যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব মিরাজকে।

গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো বিএনপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘আমিনুল হক গ্রেপ্তার হওয়ায় যুগ্ম আহ্বায়ক এজিএম শামসুল হককে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন গ্রেপ্তার হওয়ায় ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মিডিয়া সেলের সদস্য অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীকে। একইভাবে নরসিংদীতে নতুন নেতৃত্বকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণে পরের সারির নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।