বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা ও নাশকতা চেষ্টার অভিযোগে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আরও ৩৪ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তাদের আটক করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীর চকবাজার এলাকা থেকে শুক্রবার রাতে ৮ কেজি গান পাউডার ও ২১টি হাতবোমাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তারা তিনজনই বিএনপি নেতা বলে দাবি করেছে পুলিশ। আর ৮ কেজি গান পাউডার দিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ বোমা তৈরি করা যেত বলে ধারণা পুলিশের। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবির প্রধান হারুন অর রশীদ জানান, গান পাউডারসহ গ্রেপ্তাররা হলেন যুবদলের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক সাইদুল হাসান মিন্টু, ঢাকা মহানগরীর ২৯ নম্বর ওয়ার্ড (চকবাজার) যুবদলের সহসভাপতি বাশার ও চকবাজার থানা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মাসুদ।
হারুন অর রশীদ বলেন, ‘হরতাল ও অবরোধের সময় গ্রেপ্তার মিন্টু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশের এলাকায় ককটেল নিক্ষেপের দায়িত্বে ছিল। বোমা বিস্ফোরণের সময় তিনি হাতে আঘাত পান। পরে তাকে আমরা বাসায় ফেরার পথে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। বোমা কোথা থেকে সে পেয়েছে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মিন্টু জানায়, তার দুই সহযোগী বোমা বানায়। পরে তার দেওয়া তথ্যর ভিত্তিতে চকবাজারের একটি বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে বাশার ও মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ওই বাসা থেকে ৮ কেজি গান পাউডার, ২১টি হাতবোমা, অ্যাকোরিয়ামের পাথর, কাচের বোতল ও এক কেজির ওপর তারকাঁটা উদ্ধার করা হয়।’
গোয়েন্দা তথ্য ও গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা শুধু এখন না, তারা ১৯৯৯ সাল থেকে বোমা বানায়। আর তাই তাদের ২০১৩ ও ২০১৪ সালে অনেক চাহিদা ছিল। তখন তাদের মধ্যে যে যত বেশি বোমা ফাটাতে পারত সে দলে তত ভালো পদ পেয়েছে। তখন তারা অনেক বোমা ফাটিয়েছে এবং বর্তমানে থাকা পদগুলো হাতিয়ে নিয়েছে। আর গ্রেপ্তারকৃতদের আরেক নেতা হলো যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, যে এর আগে গাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিল।’
২০১৫ সালের পর রাজনৈতিক উত্তাপ কমে যাওয়ায় গ্রেপ্তার এই তিনজনের চাহিদা কমে যায় উল্লেখ করে ডিবিপ্রধান বলেন, ‘এ বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর থেকে তারা আবার বোমা বানানো শুরু করেছে। ২৭ অক্টোবর রাতে পুলিশের ওপর অনেকগুলো বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তারপর ২৮ অক্টোবর সমাবেশস্থলে অনেক বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। যেটার দায়িত্বে ছিল মিন্টুসহ যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং কেন্দ্রীয় যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম। গ্রেপ্তারকৃতরা ৫ ও ৬ নভেম্বরের কর্মসূচির জন্যও বোমা বানাচ্ছিল।’
গান পাউডারের বিষয়ে হারুন অর রশীদ বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গান পাউডারের এই চালান চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা। বোমা বানানোর জন্য বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা লোক কালেকশন (সংগ্রহ) করে। দীর্ঘদিন ধরে তারা এ কাজ করে আসছে। ভালো পদ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রদল, যুবদল নেতারা ঢাকা শহরকে অস্থিতিশীল করার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক নিয়ে এসে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটাচ্ছেন।’
নাশকতা ও সহিংসতার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গতকাল দিনভর অভিযান চালিয়ে াদের আটক করা হয়। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কিছু দুষ্কৃতকারী ও স্বার্থান্বেষী মহল হামলা ও নাশকতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা প্রতিরোধের ধারাবাহিকতায় অভিযান চালিয়ে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
র্যাব জানায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও কল্যাণপুর এলাকা থেকে দুজন, কালশী এলাকা থেকে মৎস্যজীবী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তর প্রধান) মো. জাকির হোসেন, মিরপুর থেকে মৎস্যজীবী দলের যুগ্ম সম্পাদক আবদুল বারেক, মানিকগঞ্জ সদর থেকে ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জুয়েল রানা, বগুড়া সদর থেকে কোকো স্মৃতি সংসদ গাবতলী থানা শাখার সভাপতি মো. আলপনা কবির ওরফে বড় বাবু, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা সেক্রেটারি কাজী আনিসুর রহমান, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ থেকে ১, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে ২, হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে ১, সিলেটের বটেশ্বর থেকে ১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কান্দিপাড়া থেকে ১, খুলনার রূপসা থেকে জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক মো. সাগর মোল্লা, গাজীপুরের জয়দেবপুর তেকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে সহিংসতা সৃষ্টির অভিযোগে ৩ এবং ফেনীর বিরিঞ্চি থেকে ১ জনসহ ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল শনিবার সকালে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কমলপুর এলাকা থেকে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলমসহ পাঁচ নেতাকর্মীকে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার প্রতিবাদে আজ রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে পৌর বিএনপি।
কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতিসহ পাঁচজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে বিএনপি। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আটকদের মধ্যে আছেন জেলা বিএনপি সভাপতি শরীফুল আলম, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল হক, সহসভাপতি মো. নুরুজ্জামান, শরীফুল আলমের গাড়িচালক রতন মিয়া ও নুরুজ্জামানের ভাগ্নি-জামাই মাজহার।
রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন গত শুক্রবার রাতে ঢাকা থেকে ভৈরবে ফেরার পথে নরসিংদীর রায়পুরার দৌলতকান্দি স্টেশন থেকে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা সাইফুল হককে আটক করে। আর গতকাল ভোরে শহরের কমলপুর এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয় নূরুজ্জামানকে।
এদিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় নাশকতার অভিযোগে বিএনপি-জামায়াতের ২০ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ২৫-৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। কুলাউড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ক্যশৈনু জানান, গত বুধবার কুলাউড়া পৌর ও ভূকশিমইল ইউনিয়ন এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা সড়কে গাছ ফেলে টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা ও নাশকতা শুরু করেন। পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করেছে। আসামিদের মধ্যে তিনজনকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিরা