কাজে ফিরেছেন পোশাকশ্রমিকরা পরিস্থিতি শান্ত

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক দিনের চলমান আন্দোলন শেষে গতকাল রবিবার সকালে কাজে যোগ দিয়েছেন মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়ার তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এ ছাড়া গাজীপুরে হাতে গোনা দু-একটি কারখানা ছাড়া প্রায় সব পোশাক কারখানাতেই উৎপাদন ছিল স্বাভাবিক। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় এসে বিক্ষোভ করার চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এদিকে আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ কেন্দ্র করে কয়েক দিনে আশুলিয়া থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে আশুলিয়া থানার পুলিশ। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে এসব তথ্য জানা গেছে।

রাজধানীর মিরপুরে শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও র‌্যাবের তৎপরতায় ওই এলাকার শ্রমিকরা গতকাল সড়ক ছেড়ে কাজে যোগ দিয়েছেন। সড়কে কোনো শ্রমিককে আন্দোলন করতে দেখা যায়নি।

আশুলিয়ার জামগড়া, ছয়তলা, নরসিংহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পোশাক কারখানাগুলোতে গতকাল সকাল ৮টার মধ্যে দল বেঁধে শ্রমিকরা প্রবেশ করছেন। বেরন এলাকার এনভয় গার্মেন্টস ও স্টারলিং অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানায় শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। অথচ কয়েক দিন ধরে এ এলাকাগুলোতেই শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে বেশি। কয়েকটি স্থানে সড়কের পাশে অপেক্ষারত শ্রমিকদের পুলিশ কারখানায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। সড়কের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে জলকামান। এসব এলাকার সড়কে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসার বাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হলেও আসলে তাদের ন্যূনতম মজুরি কত হবে এ নিয়ে সন্দিহান পোশাকশ্রমিকরা। যার কারণে কয়েক দিনে শ্রমিকরা কারখানায় কাজে যোগ দিয়ে আবার বেরিয়ে এসে আন্দোলন করেছেন। তাদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ন্যায্য যৌক্তিক মজুরি কাঠামো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। এই সেক্টরে যাতে আর কোনো ঝামেলা বা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটে সেদিকে সরকার লক্ষ রাখুক।

পোশাকশ্রমিক শারমিন আক্তার বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের শ্রমিকদের জীবনযাপন করা অনেক কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মজুরি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের বেতন বৃদ্ধি হয়নি। আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা চাই না। ভালোভাবে কারখানায় কাজ করে বাসায় ফিরতে চাই। আমাদের দাবি সরকার যেন দ্রুত আমাদের মজুরি বৃদ্ধি করে।’

শিল্প-পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (ইন্টেলিজেন্স) মোহাম্মদ আজাদ মিয়া বলেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিক ভাই-বোনরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে যোগদান করছেন। গত কয়েক দিন এ এলাকায় যে পরিস্থিতি ছিল আজকে তা অনেক ভালো। আমার যেটা মনে হচ্ছে গার্মেন্টস শ্রমিক ভাইয়েরা ও বোনেরা বুঝতে পেরেছেন, তাদের ভুল বোঝানো হয়েছিল। যেটা এখন তাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসব এলাকায় বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ।

এদিকে আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত আশুলিয়া থানায় তিনটি মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি ১ হাজার ৫০০ জন। ভাঙচুর হওয়া তিনটি কারখানা হলো আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকার ছেইন অ্যাপারেলস লিমিটেড, বেরন সরকার মার্কেট এলাকার হা-মীম গ্রুপের নেক্সট কালেকশন্স লিমিটেড ও ধনাইদ ইউসুফ মার্কেট এলাকার ডিসাং সোয়েটার লিমিটেড।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফি বলেন, গতকাল সকাল থেকেই তৈরি পোশাকশ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন। সবাই শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছেন। তবে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক অবস্থানে আছে পুলিশ। এ ছাড়া কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। কারা ভাঙচুর করেছে বা কারা জড়িত ছিল, সেসব বিষয় তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গাজীপুরে হাতেগোনা দু-একটি কারখানা ছাড়া প্রায় সব পোশাক কারখানাতেই উৎপাদন ছিল স্বাভাবিক। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় এসে বিক্ষোভ করার চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। সড়কে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশের ব্যাপক তৎপরতা ছিল। প্রায় সব কারখানার শ্রমিকরাই কাজে ফিরে গেছেন। তারপরও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও বিভিন্ন কারখানার সামনে অতিরিক্ত র‌্যাব-পুলিশ মোতায়েন ছিল।

কাশিমপুর থানার ওসি রাফিউল করিম রাফি জানান, সকালে সামান্য সমস্যা হলেও কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা কাজে ফিরে যান। দুপুরের খাবার বিরতি থেকে কারখানায় ফেরার সময় হঠাৎ আবার বিক্ষোভ শুরু করেন। ভাঙচুরের চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ছিল খুব কমসংখ্যক। বিক্ষোভের কারণে এলাকার কোনো কারখানায় উৎপাদনে কোনো ব্যাহত হয়নি।

গাজীপুর শিল্প-পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপস অ্যান্ড ইনন্টেলিজেন্স) মো. ইমরান আহম্মেদ জানান, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের কোনো কারখানা বন্ধ ছিল না। কাশিমপুরে কিছু শ্রমিক বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করে। পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা পিছু হটে। গাজীপুরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।