বন্দির চাপে দুশ্চিন্তা কারা কর্তৃপক্ষের

একদিকে রাজনৈতিক উত্তাপ, আরেকদিকে দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির চাপ। প্রায় প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালানো হচ্ছে বিশেষ গ্রেপ্তার অভিযান। প্রতিদিন গড়ে গ্রেপ্তার হচ্ছে অন্তত ৫০০ অপরাধী। বিএনপির নেতাকর্মীই বেশি। হঠাৎ গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষ দুশ্চিন্তায় পড়েছে। বিষয়টি তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে।

বন্দি বেড়ে যাওয়া নিয়ে গত রবিবার স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় বিশেষ বৈঠক হয়েছে। গতকাল সোমবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কারা কর্তৃপক্ষের দুশ্চিন্তার বিষয়টি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। অতি উৎসাহী হয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিদের যেন আটক বা গ্রেপ্তার করা না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কারাবন্দি সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের কড়া নজরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জ্যামারগুলো সক্রিয় করতে বলা হয়েছে। প্রতিটি সেলে কারারক্ষী বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কারাসূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।

পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হচ্ছে নিরপরাধ লোকজনও। অভিযোগে উঠেছে, সহিংসতায় জড়িত না থাকলেও মাদক মামলাসহ অন্য মামলায় তাদের জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিকাশে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। গত কয়েক দিন আদালত ও থানায় ঘুরে এ বিষয়ের সত্যতা পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দেশের ৬৮টি কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি রয়েছে। গত ২৮ অক্টোবরের পর রাজনৈতিক মামলার বন্দিরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ৬৮টি কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার ৮৬৬ জন। ৪০ হাজার ৯৩৭ পুরুষ ও ১ হাজার ৯২৯ নারী। কিন্তু বন্দি আছে ৭৭ হাজার ২০৩ জন। কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪ হাজার ৫৯০ জন। আছে ১১ হাজার ৪১৭ জন। বিএনপি দাবি করছে ২৮ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে তাদের ৫ হাজার ৮০৯ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, যাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা নাশকতার মামলা আছে, তাদেরই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ সময়ে চার হাজার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কারা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হঠাৎ বন্দি বেড়ে যাওয়ায় আমরা চিন্তিত। এ কথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। প্রতিটি সেলে অতিরিক্ত বন্দি। অনেকে গাদাগাদি করে থাকছে। শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার আতঙ্কে আছি। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় বিশেষ বৈঠক করেছে বলে জেনেছি। মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের বেশ কিছু নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। জ্যামারগুলো সচল করা হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুর পার্ট-১ ও ২, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও হাইসিকিউরিটি কারাগারে ৮৮টি জ্যামার বসানো হয়েছে। ওই যন্ত্র দিয়ে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক শূন্যের কোঠায় আনার চেষ্টা চলছে।’

তিনি বলেন, ‘কারাগার হবে সংশোধনাগার। এমন স্লোগানের কারণে কারাগার থেকে বন্দির স্বজনদের সঙ্গে দুদিন পরপর কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। ওই সময়ে বন্ধ রাখা হয় জ্যামার। এ সুযোগে অসাধু কারারক্ষীরা বন্দিদের অন্য মোবাইলে কথা বলার সুযোগ করে দেয়। রাজনৈতিক নেতারা এ সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আমরা কারাগারের সর্বত্র ব্যাকআপসহ সিসি ক্যামেরা বসিয়েছি। সিসি ফুটেজ ছয় মাস থেকে এক বছরের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। কারারক্ষী বা কারা কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা দায়িত্ব পালন করবেন তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় সরকারি এজেন্সির মাধ্যমে যাচাই করছি। রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনরা দেখা করতে এলে নজরদারি করতে বলা হয়েছে।’

কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল শেখ সুজাউর রহমান বলেন, ‘বন্দিসংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। আমরা বন্দিদের মনিটরিং করছি।’

পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারাগারে বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষসহ আমরা উদ্বিগ্ন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ে মিটিং হয়েছে। নিরপরাধ লোকজন বা তাদের স্বজনরা যাতে আটক না হয় সেদিকে বিশেষ নজর ও কারাগারের ভেতরে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। সাধারণ লোকজনের হয়রানির তথ্য আমরা পাচ্ছি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

শাজিদ খান রাজধানীর মৌচাক এলাকার একটি মার্কেটে কাপড়ের ব্যবসা করেন। গত ২২ অক্টোবর অন্যান্য দিনের মতো প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শাহজাহানপুরের বাসায় ফিরছিলেন তিনি। পথে পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়েন। কোনো অপরাধ ছাড়াই তাকে আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, তার মোবাইলে একটি ছবি পাওয়া গেছে যেখানে বিএনপির রাজনীতি করেন এমন একজন রয়েছেন। পরে তাকে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

গতকাল সোমবার আদালত প্রাঙ্গণে শাজিদের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার জান্নাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সে (সাজিদ) রাজনীতি করে না। ব্যবসার কারণে লোকজনের সঙ্গে পরিচয় ছিল। সে কারণে বিএনপি করে এমন লোকের সঙ্গে ছবি থাকতেই পারে। এটা কোনো অপরাধ? পুলিশের ইচ্ছে হলেই কাউকে ধরে নিয়ে জেলে দিচ্ছে। আমরা সাধারণ মানুষ ঝামেলায় পড়ে যাচ্ছি। আমাদের কিছু করার নেই।’

তাসলিমা আক্তার জান্নাতের মতো অসংখ্য পরিবারের সদস্যরা সিএমএম কোর্ট প্রাঙ্গণে ভিড় করেছেন। তাদের প্রিয়জন বা স্বজন অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানা গেছে। এমন পাঁচ পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। তাদের স্বজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলার ধরনে বিব্রত পরিবারগুলো। বিষয়টি নিয়ে তারা ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।