সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবিতে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর ডাকা একের পর এক হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে রাজধানীর সড়কে ১০ শতাংশেরও কম গণপরিবহন চলেছে। সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনা ছিল হাতে গোনা। এ সময়ে দূরপাল্লার বাস চলাচলও ছিল প্রায় বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে এক কোটির মতো পরিবহনশ্রমিকের কপালে পড়েছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। কেননা গাড়ির চাকা না ঘুরলে তাদের আয় বন্ধ থাকে। এখন আসছে দিনগুলোতে অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচিতে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকার শঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তারা। তাদের মনে উঁকি দিচ্ছে করোনা মহামারীকালের দুঃসহ স্মৃতি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত মোটরযান ৫৮ লাখ ৯৭ হাজার ২৪১টি। এ সংখ্যা থেকে ব্যক্তিগত শ্রেণির ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৪টি গাড়ি বাদ দিলে থাকে ৫৪ লাখ ৩০৭টি। এর মধ্যে বাস ৫৪ হাজার ১৫৮টি, কাভার্ড ভ্যান ৪৭ হাজার ৬৪টি, মাইক্রোবাস ১ লাখ ২০ হাজার ৯৩টি, মিনিবাস ২৮ হাজার ৩০৯টি, হিউম্যান হলার ১৭ হাজার ৩৮৭ এবং মোটরসাইকেল আছে ৪২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৩০টি। আর দেশে ড্রাইভিং লাইসেন্সধারীর সংখ্যা ৫৯ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৩। তবে সব ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী পরিবহনশ্রমিক হিসেবে গণ্য হন না। মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্সধারীর অনেকেই পরিবহনশ্রমিকের আওতায় বাইরে। আবার একটি বাস বা ট্রাকে চালক ছাড়াও থাকেন ২-৩ জন সহকারী (হেলপার)। করোনাকালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, তাদের সংগঠনে নিবন্ধিত ছিল ৫০ লাখ শ্রমিক। এর বাইরে আরও ২০ লাখ শ্রমিক রয়েছে বলে জানিয়েছিল তারা। ৩ বছর পর বিআরটিএর নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা আর শ্রমিক ফেডারেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে পরিবহনশ্রমিক আছেন এক কোটির মতো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাড়ির চাকা না ঘুরলে শ্রমিকের আয় বন্ধ থাকে। যদিও ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ, ২০০৬ সালের শ্রম আইন এবং সর্বশেষ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী নিয়োগপত্র দেওয়ার বিধান থাকলেও বেশিরভাগ বেসরকারি পরিবহন মালিক অতি মুনাফার লোভে চালক-শ্রমিকদের এটি দেন না। সে জন্য যে দিন কাজ করেন না, সে দিন শ্রমিকরা বেতন বা মজুরি পান না। এ ছাড়া কল্যাণ তহবিলের নামে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়মিত যে টাকা তোলা হয় তা থেকেও দুর্দিনে কোনো সাহায্য পান না তারা। তাই কোনো দিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের কাটাতে হয় মানবেতর জীবনযাপন।
সরেজমিনে রাজধানীর সদরঘাট, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাসটার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, অবরোধের মধ্যে বেশিরভাগ বাস সারি বেঁধে দাঁড় করে রাখা হয়েছে। যাত্রীর অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও ট্রিপ পাচ্ছেন না শ্রমিকরা। সেই সঙ্গে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় অনেক চালক-শ্রমিক রাস্তায় গাড়ি নামাতে চাইছেন না।
সদরঘাট থেকে গাজীপুর রোডে চলা ‘আজমেরী পরিবহনের’ একটি বাসের চালক সুমন শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একের পর এক অবরোধে সপ্তাহজুড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। বাসস্ট্যান্ডে এলেও যাত্রীর অভাবে বাস চালাতে পারছি না। তবে সংসারে তো আমি ছাড়া উপার্জনকারী কেউ নেই। সামনের দিনগুলোতে কী হবে!’
সদরঘাট থেকে মিরপুর রুটে চলা ‘তানজিল পরিবহনের’ একটি বাসের চালকের সহকারী মো. হানিফের কণ্ঠেও একই সুর। তিনি বলেন, ‘আগে খুলনা শহরে হেলপারি করতাম। সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় দুই বছর ধরে ঢাকায় আছি। ঢাকায় এখন জীবন নিয়ে ঝুঁকিতে আছি। রাতে বাসে ঘুমানোর সময় কখন আগুন লাগিয়ে দেয়, সেই দুশ্চিন্তায় থাকি। অবরোধের কয়দিন গাড়ি বের হয়নি। কী করার আছে, গাড়ির চাকা না ঘুরলে সংসারের চাকা ঘুরাব কীভাবে?’
সিটিতে চলা ‘দিশারী পরিবহনের’ চালক সোহরাব মিয়া বলেন, ‘পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হলেই তো আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। আবার গাড়ি নিয়ে না বের হলে আয় বন্ধ। পরিস্থিতি কবে ঠিক হবে কিছুই বলা যাচ্ছে না। সামনে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
সায়েদাবাদ টার্মিনাল এলাকায় ঢাকা-সিলেট রুটে চলা ‘শ্যামলী পরিবহনের’ একটি বাসের সহকারী হান্নান মিয়া বলেন, ‘করোনার সময় বড় ধরনের আর্থিক সমস্যায় পড়েছিলাম গাড়ি না চলাচল করায়। সেই পরিস্থিতি সামলাতে না সামলাতেই এখন আবার অবরোধের কারণে খুব খারাপ সময় পার করছি। দেশে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে গাড়ি না চলায় একেবারেই বসে আছি। আমাদের কেউ কোনো সহযোগিতা করে না। কার কাছে সাহায্য চাইব, সেটিও জানি না।’
মো. রাকিব মিয়া নামে একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক বলেন, ‘রাস্তায় সিএনজি নামানোর আগে মাথায় রাখতে হয় মালিককে কত টাকা দিতে হবে। সেই টাকা ওঠাতে পারব তো। কারণ অবরোধে তো যাত্রী পাওয়া যায় না। সেখানে সিএনজি নিলে দিন শেষে জমার টাকা কোথা থেকে দেব। এভাবেই দুশ্চিন্তায় দিন যাচ্ছে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পরিবহনশ্রমিকের সংখ্যা কত সে হিসাব সুনির্দিষ্টভাবে কারও কাছে নেই। শ্রমিক ফেডারেশনের কাছে যত সংখ্যা আছে তার থেকে বহুগুণে আছে যাদের নাম তালিকায় নেই। আর বর্তমানে দেশের যে পরিস্থিতি, সেখানে পরিবহনশ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গাড়ি না চললে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। অথচ সড়ক আইনে নির্দেশনা দেওয়া আছে প্রত্যেক শ্রমিককে নিয়োগপত্র দিতে হবে। নিয়োগপত্র দেওয়া শ্রমিকের সংখ্যা খুবই কম। নিয়োগপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর আমাদের শ্রমিকরা আছেন। পরিবহন মালিকদের কাছে জিম্মি হওয়ার জন্যই আজ করুণ অবস্থা তাদের।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাস্তাঘাটে যখন গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক থাকে সে সময় শ্রমিকদের কল্যাণের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদা ওঠানো হয়। শ্রমিকদের এই দুর্দিনে সেই টাকাগুলো গেল কোথায়। কারা শ্রমিকদের টাকায় নিজেদের পকেট ভারী করে তাদের খোঁজা হোক। সেই সঙ্গে সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, পরিবহনশ্রমিকদের সঠিকভাবে তালিকা করে সবাইকে সাহায্যের আওতায় আনা হোক।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার সময় আমরা দেখেছি পরিবহনশ্রমিকরা কতটাই না মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। আর সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, হরতাল-অবরোধে তাদের গাড়ি না চলায় ফের মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। তবে শ্রম আইনে পরিবহনশ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও নিয়োগপত্র দেওয়ার যে বিধান রযেছে, সেগুলো কিন্তু পরিবহন মালিকরা মানছেন না। পরিবহনশ্রমিকদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছেন বেশিরভাগ মালিক। তাদের চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালাতে বাধ্য করে। সে জন্য গাড়ি না চালালে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। এখন যদি শ্রম আইন মেনে সব পরিচালনা করা হতো তাহলে গাড়ি চালু, নাকি বন্ধ, সেগুলো নিয়ে পরিবহনশ্র্রমিকদের চিন্তা করতে হতো না। কারণ গাড়ি না চললে মাস শেষে ঠিকই টাকা পেত নিয়োগপত্র থাকলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সড়কে পরিবহনশ্রমিকদের যে তথ্য, সেগুলোরও অনেক গরমিল থাকে। আর এই শ্রমিকদের উন্নয়নের নাম করে যেসব তহবিল হয়, সেগুলোও অনেক প্রশ্নবিদ্ধ থাকে। তবে সেই তহবিল যারা পরিচালনা করেন, তাদের উচিত এই খারাপ সময়ে শ্রমিকদের পাশে থাকা।’