হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে প্রভাব পড়ছে বাজারে। আগুন-ভাঙচুরের ঝুঁকির কারণে দূরপাল্লার যান চলাচল প্রায় অচল। মোকামে পাইকাররা যেতে পারছেন না। ফলে শীতের সবজি বাজারে তোলার সময় হলেও ক্রেতার অভাবে ক্ষেতেই ফেলে রাখছেন কৃষকরা। সে কারণে খুচরা বাজারে কমার পরিবর্তে সবজির দাম বাড়তির দিকে। অন্য পণ্যের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবন আরও কঠিন করে তুলেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অন্তত ১০ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) পরিচালিত ২০১৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৪৮ শতাংশের বেশি মধ্যবিত্ত বেসরকারি চাকরি করেন। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির অভিঘাত এই মধ্যবিত্তের ওপরেই বড় আঘাত হানছে।
কয়েকটি বাজারে সরেজমিনে দেখা গেছে, চলতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় সব ধরনের সবজি কেজিপ্রতি ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানিকগঞ্জের সদর উপজেলার আড়াইমারা গ্রামের ভাটপাড়া বাজার থেকে সবজি কেনেন তিনি। স্বাভাবিক সময়ে সেখান থেকে কারওয়ান বাজারে এক গাড়ি সবজি আনতে দেড় হাজার টাকার মতো খরচ পড়ে। গত ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর হরতাল-অবরোধে ট্রাক ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাড়তি ভাড়া যোগ করলে প্রতি কেজি সবজি কিনতে ভোগান্তিদের ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
তিনি জানান, আড়তে কৃষকরা প্রতিটি ফুলকপি (১ কেজি ওজন) ১২-১৫ টাকায় বিক্রি করেন। আড়তদাররা সেটা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন ২০-২২ টাকায়। পাইকাররা কারওয়ান বাজারে বিক্রি করেন ২৫-২৭ টাকায়। আর খুচরা বিক্রেতারা শহরের বিভিন্ন বাজারে ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি করছেন।
এই পাইকারি ব্যবসায়ী আরও জানান, মানিকগঞ্জ থেকে কারওয়ান বাজারে ট্রাকে ফুলকপি আনতে প্রতিটিতে খরচ পড়ত আড়াই টাকা। এখন খরচ হচ্ছে পাঁচ টাকা। ওঠাতে-নামাতে যেখানে আগে ২-৩ টাকা খরচ হতো, সেখানে এখন পাঁচ টাকার মতো খরচ হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতিটি ফুলকপিতে ৭-১০ টাকা বাড়তি লাগছে।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, যশোর ও আশপাশের এলাকায় এই ফুলকপি কৃষকদের কাছ থেকে ৭-৯ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। হরতাল-অবরোধের কারণে ওই অঞ্চলের পণ্য একেবারেই আসছে না। ফলে মানিকগঞ্জ, নরসিংদীর মতো রাজধানীর আশপাশের জেলার কৃষকরা কিছুটা লাভবান হলেও ভোক্তাপর্যায়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে।
তেজগাঁও এলাকার মিনি পিকআপের মালিক হামিদ জানান, তিনি ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে ট্রাক ভাড়ায় চালান। তবে এখন পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে রাস্তায় ট্রাক নামানোই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ভাটবাউর বাজারের পাইকার লাল মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন শীতকালীন সবজির ভরা মৌসুম। কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারণে ঢাকার পাইকারদের অনেকে আসেন না। যারা ঝুঁকি নিয়ে আসছেন ট্রাক সংকটের কারণে ভাড়া বেশি দিতে হয় তাদের। ফলে ভোক্তাপর্যায়ে সবজির দাম বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে সদরের আড়াইমারা গ্রামের কৃষক বশির উদ্দিনের ভাষ্য, মাঠ থেকে ফসল তোলার সময় এখন। কিন্তু পাইকার না আসায় সবজির বেচাকেনা কম। সেজন্য অনেকেই সবজি তুলছেন না।
কারওয়ান বাজার আড়ত ভবন মালিক সমিতির সেক্রেটারি সাইফুর রহমান চৌধুরী জানান, ‘অবরোধের একটা প্রভাব বাজারে পড়েছে। বাজারে সবজির সরবরাহ থাকলেও সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে যেসব অঞ্চল থেকে সহজে সবজি আসে তা পরিমাণে কমেছে। কিছু কিছু সবজির সরবরাহ নেমেছে ৫০ শতাংশে।’
শান্তিনগর বাজারে কথা হয় চাকরিজীবী মো. মালেকের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে দেড়শ টাকার কাঁচাবাজার কিনলে দুই দিন চলে গেছে, এখন দুই দিন চালাতে ২০০-২২০ টাকার কাঁচাবাজার লাগছে।
এখনো অস্বস্তি রয়েছে পেঁয়াজের দরে। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। আমদানি করা পেঁয়াজ মানভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০-১১০ টাকায়। চলতি মৌসুমে আলুর দাম বেড়ে কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা হয়ে গিয়েছিল। আমদানির আলু আসার পর সেটা ৩০-৪৫ টাকায় নেমে এসেছে।
এ ছাড়াও চাল, ডাল, তেল, নুন, চিনি, আটা, ময়দা, আদা, রসুন সবকিছুর দাম আগের কয়েক দিনের তুলনায় বেশি দেখা গেছে। আমদানির পরও ডিমের ডজন এখনো ১৪৫ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ১৯০-২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।