অতি সাধারণ পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা এক সফল গভর্নরের কথা

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান। ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। এর আগে ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক। তারও আগে ছিলেন উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব জুড়ে তার নাম-ডাক।

তিনি জন্মেছিলেন জামালপুরের এক পাড়াগাঁয়ে। তার বাবা ছিলেন একজন অতি দরিদ্র প্রায় ভূমিহীন কৃষক। পাঁচ ভাই, তিন বোন ও বাবা-মা, দশজনের এক বিশাল পরিবার চলত খুবই কষ্টে-সৃষ্টে।

তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি মায়ের কাছে। তিনি কিছু লেখাপড়া জানতেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও তৃতীয় শ্রেণির বেশি পড়ার সুযোগ হলো না। স্কুল ছেড়ে কিছু বাড়তি আয়ের চেষ্টা করতে লাগলেন ছোট্ট আতিউর।

তাদের একটি গাভি ও কয়েকটা খাসি ছিল। তিনি শুরু করলেন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের মাঠে চরানো। বিকেল বেলা গাভির দুধ নিয়ে বাজারে গিয়ে বিক্রি করতেন। কিছুদিন পরে দুধ বিক্রির আয় থেকে সঞ্চিত কিছু টাকা দিয়ে তিনি শুরু করলেন পান-বিড়ির দোকান। হাটের দিন তিনি সেই দোকান চালাতেন। বাকি সময় কৃষিকাজ করতেন। এক বিকেলে বড় ভাই তাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন নাটক দেখতে। সেই আনন্দময় পরিবেশ দেখে ঠিক করলেন আবার স্কুলে ফিরবেন, পড়াশোনা শুরু করবেন। তার কথায় রাজি হলেন বড় ভাইও। পরদিন দুই ভাই আবার স্কুলে গেলেন। বড় ভাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেমকে ছোট্ট আতিউরের ইচ্ছার কথা জানালে তিনি হেসেই উড়িয়ে দিলেন। ব্যঙ্গাত্মকভাবে বললেন, সবাইকে দিয়ে কি লেখাপড়া হয়!

প্রধান শিক্ষকের কথা শুনে দুই ভাইয়ের বুক ভেঙে গেল। কিন্তু আতিউরের বড় ভাই অনেক পীড়াপীড়ি করে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি জোগাড় করলেন। পরীক্ষার তখন আর মাত্র তিন মাস বাকি। ঘরে খাবার নেই, পরনে কাপড় নেই। নেই কোনো বই। মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পড়াশোনার জন্য উঠলেন পাশের গ্রামের ক্লাসের ফার্স্টবয় মোজাম্মেলের বাসায়। শুরু হলো পড়াশোনা। তার মামা আশরাফ সাহেব তাকে পড়াশোনায় সাহায্য করেছিলেন। সে কথা তার এখনো মনে আছে। দিন-রাত পড়তেন সে সময়টায়।

যথাসময়ে পরীক্ষা শুরু হলো। ফল প্রকাশের দিন সেই প্রধান শিক্ষকই নিয়ে এলেন ফলাফল। কিন্তু ঘোষণা করার আগে বারবার পড়লেন, যেন নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। অবশেষে ঘোষণা করলেন, আতিউর রহমান প্রথম হয়েছেন। তৃতীয় শ্রেণি থেকে এভাবেই চতুর্থ শ্রেণিতে উঠলেন। ফল শুনে বড় ভাই আনন্দে কেঁদে ফেললেন।

এই ফল তার জীবনকে বদলে দিল। তার নিরক্ষর বাবাও বুঝলেন আতিউর মেধাবী, সে পড়াশোনা করে জীবনে বড় কিছু হবে। এই ছেলেটি গরু-ছাগল চরিয়ে বা পান-বিড়ির দোকানে দোকানদারি করার জন্য জন্মেনি। তাই যখন শুনলেন আতিউর ওপরের ক্লাসে উঠেছে, সেই ক্লাসে পড়াশোনার জন্য নতুন বই লাগবে তখন একটুও দ্বিধা না করে ১২ টাকায় একটি খাসি বিক্রি করে জামালপুর গিয়ে লাইব্রেরি থেকে বই কিনে আনলেন। চৌদ্দ মাইল হেঁটে আতিউর তার বাবার সঙ্গে গিয়ে বই কিনে এনেছিলেন।

শুরু হলো তার নতুন জীবন। প্রতিদিন স্কুলে যান, পড়াশোনায় ভালো। স্যারদের সুনজর লাভ করলেন। ফয়েজ মৌলভি স্যার সন্তানের মতো দেখাশোনা করেন। আবারও প্রথম হলেন। পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলেন। তার পরের ক্লাসেও তিনি একই ফল করলেন। এরপর ভর্তি হলেন দিঘপাইত ধরণি কান্ত হাই স্কুলে। তার বড় চাচা (জ্যাঠা) ছিলেন ওই স্কুলের প্রাথমিক শাখার শিক্ষক। সপ্তম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সময় তার শিক্ষক চাচা জামালপুর থেকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন এনে তাকে দেখালেন। ফরম পূরণ করে ডাকযোগে পাঠিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। লিখিত পরীক্ষা দিতে ময়মনসিংহ শহরে যান। এটিই ছিল তার প্রথম জেলা শহরে যাওয়া। পরীক্ষার দুই মাস পর চিঠি পেলেন, নির্বাচিত হয়েছেন। চূড়ান্ত মৌখিক ও মেডিকেল পরীক্ষা ছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে।

সাক্ষাৎকারে পরে যাওয়ার জন্য ছিল না ফুলপ্যান্ট। স্কুলের সহকারী ফালু স্যারের ফুলপ্যান্ট ধার করে পরে গিয়েছিলেন ভাইভা বোর্ডে। পরীক্ষকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ এম. ডব্লিউ. পিট। আর ছিলেন রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের অধ্যক্ষ কর্নেল রহমান। মি. পিট বুঝলেন আতিউরের সংগ্রাম। এই পর্যন্ত এসে পৌঁছাতে তাকে কত কিছু পাড়ি দিতে হয়েছে। সাক্ষাৎকার ভালোই হলো। কিন্তু ফলাফল আর আসে না। হঠাৎ তিন মাস পর চিঠি এলো। তিনি মনোনীত হয়েছেন ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য। তবে তাকে মাসিক বেতন ১৫০ টাকা। এর মধ্যে ১০০ টাকা বৃত্তি দেওয়া হবে, বাকি ৫০ টাকা দিতে হবে পরিবারকে। প্রথমে তিন মাসের আংশিক বেতন বাবদ ১৫০ টাকা নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু বাবা-মা বা চাচা কারও এই সামর্থ্য ছিল না।

উপায়ান্তর না দেখে সব খুলে বললেন ফয়েজ মৌলভি স্যারকে। তিনি এবং আরও দুজন শিক্ষক পরদিন আতিউরকে নিয়ে হাটে গেলেন। সেখানে গামছা পেতে দোকানে দোকানে ঘুরলেন। সবাইকে বিস্তারিত বলে সাহায্য চাইলেন। সবাই সাধ্যমতো সাহায্য দিলেন। সব মিলিয়ে ১৫০ টাকা হলো। সেই টাকা দিয়ে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলেন।

আতিউরের চিন্তা তিন মাস পরে কীভাবে তিনি বেতন দেবেন। ক্যাডেট কলেজের বাংলার শিক্ষক আল আমীন স্যারকে তার সমস্যার কথা জানালেন। তিনি স্কুলের অধ্যক্ষ এম. ডব্লিউ. পিটকে জানাবেন বললেন। ইতিমধ্যে মি. পিট তার হোস্টেলে এসে তার লেখাপড়ায় মনোযোগ কতটা তা দেখতেন। ক্লাসেও তার লেখাপড়া ভালো করার আগ্রহ লক্ষ করতেন। তাই আল আমীন স্যারের প্রস্তাবমতো তৎকালীন জিওসির সঙ্গে আলাপ করে পুরো বেতনটাই বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করলেন, এইচএসসিতে নবম স্থান অধিকার করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পর বিআইডিসের গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। পেশাগত জীবনে সফল ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্বও পালন করেছেন।

অথচ যখন পান-বিড়ির দোকানে দোকানদারি করতেন তখন তিনি বা অন্য কেউ কি ভেবেছিলেন তিনি হবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর? আসলে পরিশ্রম ও একাগ্রতা থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। ড. আতিউর রহমান তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর ড. রহমান তার এই সংগ্রামী জীবন নিয়ে কথা বলতে মোটেও দ্বিধা করেন না। তবে তার এই সাফল্যের জন্য পিতা-মাতা, শিক্ষকরা এবং স্ত্রীর অবদানের কথা বলতে ভুল করেন না। তিনি আরও বলেন, এই সমাজের কাছে তিনি চিরকৃতজ্ঞ।