বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, চোরাগোপ্তা হামলা করে সরকার হটানো যায় না। তারা (বিএনপি) অবরোধের নাম করে বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালিয়ে মানুষকে আহত করছে। পুলিশ ও সাংবাদিকের ওপর হামলা করছে। বিএনপির এমন সন্ত্রাসী কর্মকা- আমরা যুগ যুগ ধরে দেখে আসছি।
গতকাল রবিবার বিকেলে নরসিংদীর মুসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়ামে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নবনির্মিত ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার (জিপিইউএফএফ) উদ্বোধন উপলক্ষে এ জনসভার আয়োজন করা হয়। এ সময় শেখ হাসিনা নৌকার পক্ষে ভোট চাইলে উপস্থিত জনতা হাত তুলে সায় দেয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই নভেম্বর মাস যেখানে পরীক্ষা হচ্ছে তারা অবরোধ দেয়, সামনে আসার সাহস নেই। প্রধান বিচারপতির বাসায় আক্রমণ, জাজেস কমপ্লেক্সে আক্রমণ, হাটবাজার-দোকানপাট কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না। চোরাগোপ্তা হামলা করে সন্ত্রাস করে সরকার হটানো যায় না। অস্ত্র চোরাকারবারি, মানি লন্ডারিংয়ে যুক্ত তারেক লন্ডনে বসে এত টাকা পায় কোথায়? আগুন সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির চলমান ‘আগুন সন্ত্রাসের’ কথা উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘২০০৭ সালে তারেক রহমান মুচলেকা দিয়েছিল আর কোনোদিন রাজনীতি করবে না। এখন লন্ডনে পালিয়ে থেকে দেশে আগুন দিয়ে গাড়ি পোড়ার কথা বলে। তাকে আমি বলতে চাই “আরে বেটা তোর যদি সাহস থাকে তাহলে বাংলাদেশে আয়। দেখি তোর সাহস কত”।’
ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘ইসরায়েলিরা যেভাবে ফিলিস্তিনের হাসপাতালে বোমা নিক্ষেপ করে বিএনপির সন্ত্রাসীরা ঠিক সেভাবে মানুষের ওপর হামলা করছে। এতে আমার তো মনে হয়, তারা কি ইসরায়েলের জারজ সন্তান কি না!’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির ক্ষমতা মানেই দেশ পেছনে যাওয়া। আওয়ামী লীগ সরকার ৮০০ টাকা থেকে মজুরি বাড়াতে বাড়াতে সাড়ে ১২ হাজার করেছে। অন্য কোনো সরকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বাড়ায়নি। প্রত্যেকটা গ্রাম যেন শহর হয়, শহরের সুবিধা যেন গ্রামের মানুষ পায়, এজন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। আইটি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছি, এতে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছে। ঘরে বসে আয় করছেন। সরকারি চাকরির বাইরে যারা আছেন তাদের সবার জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা করেছি। ১০৯টা অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি যেন আমাদের ছেলেমেয়েরা কাজ করতে পারে। বিনা জামানতে ঋণ ২ লাখ টাকা পাওয়া যাচ্ছে, তাই যারা বেকার তারা ব্যবসা করেন, নিজেরা আয় করুন।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমরা জনগণের জন্য কাজ করি। বিএনপির কাজ ধ্বংস করা। ১৫ বছরে কত পরিবর্তন, সেটা আপনারা নিজেরাই দেখছেন। নরসিংদীর তাঁত, সবজি, বিখ্যাত সাগর কলা যেন দ্রুত ঢাকা যায় সে ব্যবস্থা করেছি।’ এ সময় এই অঞ্চলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘নৌকায় ভোট দিয়েছেন, এরপর দেশের উন্নয়ন হয়েছে। আমি আমার বাবা, মা, ভাইদের, স্বজনদের হারিয়েছি। আমরা দেশে আসতে পারিনি। আমার অবর্তমানে আমাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয়। এক প্রকার জোর করেই দেশে ফিরেছিলাম। আমি বিচার চাইতে পারব নাN এমন দেশে ফিরেছিলাম একটা প্রত্যয় নিয়ে সেটা হলো, যে দেশ আমার বাবা স্বাধীন করে দিয়ে গেছে সেটা ব্যর্থ হতে দেব না। এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করাই আমার লক্ষ্য। আমার কাছে আপনারা ছাড়া আর কেউ নেই। আমি যা করছি, সবই দেশের জন্য, দেশের জনগণের জন্য।’
তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে দেশের সার্বিক উন্নয়নে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কথা দিয়েছিলাম ঘরে ঘরে আলো জ¦লবে, আমরা সেই কথা রেখেছি। এখন দেশে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা গ্রহণ করা হচ্ছে। ভর্তুকি দিয়ে দেশের মানুষের জন্য খাদ্যপণ্য সরবরাহ করে যাচ্ছি।’
নরসিংদীবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের উন্নয়নকাজ অব্যাহত রাখার জন্য আওয়ামী লীগকে আবারও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন এবং নরসিংদীর পাঁচটি আসনেই বিজয়ী করবেন।’ একই সঙ্গে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘আমি যাকে মনোনয়ন দেব তার পক্ষেই কাজ করতে হবে।’
১৯ বছর পর শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় গোটা নরসিংদী জেলায়। সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে দলে দলে নেতাকর্মীরা রঙ-বেরঙের ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে, রঙিন গেঞ্জি ও টুপি পরে যোগ দেয় জনসভাস্থলে। বেলা ১১টায় সমাবেশস্থলের গেট খুলে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে জনসভাটি রীতিমতো জনসমুদ্রে রূপ নেয়। স্টেডিয়ামে স্থান সংকুলান না হওয়ায় দীর্ঘপথের নানা জায়গায় হাজার হাজার মানুষ অবস্থান নেয়। বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে জনসভাস্থলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।
নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিএম তালেব হোসেনের সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, আওয়ামী লীগের সভাপতি-লীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি, নরসিংদী-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু, নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনের এমপি জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন, নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের এমপি নজরুল ইসলাম বাবু, মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি তামান্না নুসরাত বুবলি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন প্রমুখ।
পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পীরজাদা কাজী মোহাম্মদ আলী এবং নরসিংদীর পৌর মেয়র আমজাদ হোসেন বাচ্চু।
এর আগে দুপুর পৌনে ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় বহুকাক্সিক্ষত ফার্টিলাইজার প্রকল্প অর্থাৎ এশিয়ার বৃহত্তম সার কারখানা হিসেবেখ্যাত ‘পলাশ-ঘোড়াশাল সার কারখানা’ উদ্বোধন করেন। ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব কারখানাটিতে বার্ষিক ৯ লাখ ২৪ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদিত হবে। এ মেগাপ্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ২১ লাখ টাকা। যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ৪ হাজার ৫৮০ কোটি ২১ লাখ টাকা আর জাপান ও চীনের ঠিকাদারদের যৌথ কনসোর্টিয়াম ব্যাংক অব টোকিও-মিৎসুবিশি ইউএফজে লিমিটেড (এমইউএফজি) ও দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি) ১০ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ঋণ দেয়।
সার কারখানা উদ্বোধনের পর পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক সুধী সমাবেশ হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আজকের এ প্রকল্পের পেছনে আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ জাপান ও চীনের সহায়তার জন্য আমরা ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে ধন্যবাদ জানাই শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে।’
শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, ‘দেশের সারের চাহিদা পূরণের জন্য ২০১৪ সালে আমরা প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করি এই পুরাতন সার কারখানাটিকে সংস্কার করে নতুন করে কারখানা নির্মাণের। সেই থেকে আমরা আজ কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছি।’
বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিএনপির আমলে সারের জন্য কৃষক হাহাকার করত। এমনকি সারের জন্য অনেক কৃষককে প্রাণ দিতে হয়েছে। আমরা তখনই প্রতিজ্ঞা করি যে, আমরা ক্ষমতায় গেলে এ দেশের কৃষকের দুঃখ দূর করব। সেই লক্ষ্যে আমরা দেশের সারের চাহিদা পূরণের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করে যাচ্ছি। এখন সারের জন্য কোনো কৃষককে কষ্ট করতে হয় না।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমার কাছে দেশের স্বার্থ বড়, ক্ষমতা বড় নয়। আমরা যা কিছু করছি তা সবই করছি দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে।’
শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের সভাপতিত্বে এ সুধী সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা, পলাশ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দীলিপ, বিসিআইসির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক রাজিউর রহমান মল্লিক, জেলা প্রশাসক ড. বদিউল আলম প্রমুখ।
০