পুলিশের গুলিতে আহত আরেক শ্রমিকের মৃত্যু

গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়া ইসলাম গার্মেন্টসের সুপারভাইজার জালাল উদ্দিন (৪২) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মারা গেছেন। গত শনিবার দিবাগত রাতে হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার মৃত্যু হয়।

ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. বাচ্চু মিয়া মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট থানায় অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে গাজীপুরে তুসুকা কারখানা ভাঙচুরের ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করেছে। মামলায় ২৪ জনের নামে এবং অজ্ঞাত আরও ২০০ জনকে আসামি করে কোনাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

এছাড়া সাভারের আশুলিয়ায় গতকালও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ থাকে। শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের জেরে গত কয়েক দিনের বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত আশুলিয়া থানায় ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জালাল উদ্দিনের স্ত্রী নার্গিস পারভিন মর্গের সামনে মেয়েকে জড়িয়ে কাঁদছিলেন। তিনি জানান, প্রতিদিনের মতো সকালে তার স্বামী কারখানায় গিয়েছিলেন। আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করায় তিনি বাসায় ফিরছিলেন। ওই সময় তিনি তার মেয়েকে নিয়ে স্কুলে ছিলেন। সেখানে থেকে খবর পান তার স্বামী পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছে। পরে তাকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

তিনি বলেন, তার স্বামী ইসলাম গার্মেন্টসে সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করত। শ্রমিক আন্দোলনে যাননি। তিনি শ্রমিক নেতাও ছিলেন না। কিন্তু তারপরও কেন সে গুলি খেল। আজ তো তার সব শেষ হয়ে গেল। এখন তো তার কিছুই রইল না। আমি কী নিয়ে থাকব? মেয়ে ২য় শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল বাকিয়া চেয়েছিল সুস্থ হলে বাবার কোলে চড়ে বাসায় ফিরবে। কিন্তু আর কোনোদিন তার বাবার কোলে ওঠা হবে না।

এ ঘটনার বিচার দাবি করে নার্গিস বলেন, তার স্বামীকে যারা হত্যা করল এই দায় কে নেবে? তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার স্বামী হত্যার বিচার চান।

মায়ের কান্না দেখে ৯ বছরের শিশু জান্নাতুলও কান্না করছিল আর বারবার চোখ মুছছিল। মায়ের কান্না দেখে অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

গাজীপুর : গতকাল রবিবার ২৫টি পোশাক কারখানা বন্ধ থাকে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। আর কোনাবাড়ীতে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের সময় তুসুকা কারখানা ভাঙচুর, লুটপাট, মারধর ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় ২২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

এর আগে গত বুধবার সকালে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে পোশাক শ্রমিক আঞ্জুয়ারা খাতুন (৩০) গুরুতর আহত হন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর থেকে গাজীপুরের পোশাক কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। কোনো পোশাক শ্রমিককে বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যায়নি। তবে শ্রমিকদের মধ্যে গ্রেপ্তারের একটি আতঙ্ক রয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিরপরাধ কাউকে পুলিশ কিছু বলবে না। যারা নাশকতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়েছিল তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।

সাভার : গতকাল সকালে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় গিয়ে কারখানা বন্ধের নোটিস দেখেছেন কয়েকজন পোশাক শ্রমিক। বেরণ এলাকার এনভয় গ্রুপের মানাটা গার্মেন্টসের শ্রমিক জুয়েল রানা বলেন, শনিবার কারখানার সামনে এসে কারখানা বন্ধের নোটিস দেখে বাসায় ফিরে গেছি। আজও (রবিবার) এসে দেখি কারখানা বন্ধ। কবে খুলবে তাও জানি না। সারা দিন কাজ করা অভ্যাস, তাই বাসায় বসে থাকতেও ভালো লাগে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাভারের আশুলিয়ায় গতকাল শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ থাকে। যেখানে শনিবার সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে মোট বন্ধ কারখানার সংখ্যা ছিল ১৩০। খোলা কারখানাগুলোর মধ্যে ৮ থেকে ১০টি কারখানার শ্রমিকরা সকালে কারখানায় এসে কার্ড পাঞ্চের পর কাজ না করে বসে ছিলেন। পরে কিছু সংখ্যক শ্রমিক কারখানা থেকে চলে যান। কাজ না করায় কয়েকটি কারখানায় গতকাল সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করে পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের জেরে গত কয়েক দিনের বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত আশুলিয়া থানায় ১২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিককে আসামি করা হয়েছে। যার মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।