নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফের বিরুদ্ধে এবার রাজধানীর উপকণ্ঠে মুন্সীগঞ্জ শহর লাগোয়া ধলেশ্বরী নদী তীরের ফসলি জমি জোর করে দখলের অভিযোগ উঠেছে। মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার চরকিশোরগঞ্জ (মোল্লারচর) এলাকায় ধলেশ্বরী তীরে শিপইয়ার্ড গড়ে তুলেছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এ সংসদ সদস্য। আর মূল সড়ক থেকে সেই শিপইয়ার্ডে যাতায়াতের জন্য শুরু করেছেন আধা কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের কাজ। কিন্তু ফসলি জমি দখল করে এ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ অন্তত ১০টি পরিবারের।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাস্তার জন্য জমি দখল করে কয়েক দিন আগে বালু ভরাটের কাজ শুরু করেছে এমপি লতিফের লোকজন। তার হয়ে জমি দখল ও বালু ভরাটে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন শিপইয়ার্ডকে চরকিশোরগঞ্জ এলাকার প্রধান সড়কে সংযুক্ত করতে পরিবারগুলোর ফসলি জমিতে প্রথমে বাঁশের কাঠামো তৈরি করা হয়। পরে সেখানে ড্রেজারের পাইপ স্থাপন করে গত শুক্রবার থেকে শুরু হয় বালু ভরাট। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা জমি দখল ও বালু ভরাটের ঘটনায় মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় অভিযোগ করেন। কিন্তু পুলিশ উল্টো ভুক্তভোগীদের শাসালেও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মকবুল হোসেন ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট করে সংসদ সদস্যের শিপইয়ার্ডে যাতায়াতের সড়কটি নির্মাণ করে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে পৌরসভার উত্তর ইসলামপুর এলাকার প্রয়াত আবদুল খালেকের ছেলে আনোয়ার মুন্সী জমি দখলে সংসদ সদস্যের পক্ষে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে দুই থেকে আড়াই একর জমি কিনে গ্লোব শিপইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এমপি লতিফ। আর শিপইয়ার্ড গড়ে তোলার শুরু থেকেই তিনি ধলেশ্বরী তীরে নানাভাবে জমি দখল শুরু করেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। বর্তমানে তার শিপইয়ার্ডে জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ থেকে ৯ একর। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি দখলে নিতে সংসদ সদস্যের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে টার্গেট করা ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় চাঁদাবাজির মামলা করা। ২০১৯ সালে গ্লোব শিপইয়ার্ডের প্রজেক্ট ম্যানেজার যুবায়ের হোসেন বাদী হয়ে স্থানীয় ১০ জনকে আসামি করে সদর থানায় চাঁদাবাজির একটি মামলা করেন। একই সঙ্গে আদালতেও সংসদ সদস্যের পক্ষে আলম মাদবর নামে এক ব্যক্তি স্থানীয় ২০-২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। গত মাসে শিপইয়ার্ডে যাতায়াতের জন্য এলাকার প্রধান সড়ক থেকে ধলেশ্বরী তীরে যেতে অন্তত ১০টি পরিবারের জমির ওপর দিয়ে দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয়। এ সড়ক নির্মাণ বন্ধে জমির মালিকরা দ্বারস্থ হন সদর থানা পুলিশের। চরকিশোরগঞ্জ এলাকার আলী আকবর আনোয়ার তার বাড়িসংলগ্ন জমি দখল ও বালু ভরাট বন্ধে গত ২৯ অক্টোবর সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। এরপর কহিনূর বেগম ও মো. মোফাজ্জল হোসেন তাদের পৈতৃক সম্পত্তি দখলে নিয়ে বালু ভরাটের পাঁয়তারার অভিযোগে থানায় লিখিত চিঠি দেন। অভিযোগ পেয়ে সদর থানার ওসি তদন্তের ভার দেন এসআই এনামুল ম-লকে। কিন্তু এসআই এনামুল এলাকায় গিয়ে উল্টো ভুক্তভোগীদের শাসিয়ে আসেন। আর সেই সুযোগে গত ১০ নভেম্বর বালু ভরাট শুরু করে সংসদ সদস্যের লোকজন।
গতকাল সোমবার সকালে মোল্লারচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়কের পর রয়েছে স্থানীয়দের ফসলি জমি। ধলেশ্বরী তীরের ওই জমিগুলোতে বাদাম, আলু, টমেটো, খিরাসহ মৌসুমি সবজি চাষাবাদ হয়। সেই জমির বুকের ওপর দিয়েই শিপইয়ার্ডে যেতে সড়ক নির্মাণে বালু ভরাটের কাজ চলছে। গ্লোব শিপইয়ার্ডসংলগ্ন ধলেশ্বরী নদীতে আনলোড ড্রেজার বসানো হয়েছে। সেখান থেকে আধা কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজারের পাইপ চলে গেছে। আর ওই পাইপের সাহায্যে সড়ক নির্মাণে জমিতে ফেলা হচ্ছে বালু। নির্মাণাধীন সড়কটি প্রায় ২০ ফুট চওড়া হতে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলেন, বালু ভরাটের কাজ করছেন মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মকবুল হোসেন। তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তাই ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নিজেদের জমি রক্ষায় কিছুই করতে পারছে না। কাউন্সিলর মকবুল নিজেই উপস্থিত থেকে ভুক্তভোগীদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। চালিয়ে যাচ্ছেন বালু ভরাট কাজ।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আরও জানায়, মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার উত্তর ইসলামপুর এলাকার আনোয়ার মুন্সী ওরফে ঠেলাগাড়ি আনোয়ার একসময় মাটি টানার ভ্যান গাড়ি চালাত। এমপি লতিফের হয়ে ধলেশ্বরী তীরের জমি দখল করে দিয়ে এখন কোটিপতি। সাধারণ কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন পন্থায় টাকা ছাড়া কিছু জমি নিজের নামে করে নেয়। এরপর এমপি লতিফ ও পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় মানুষের জমি না কিনে দখল নিতে থাকে। কেউ বাধা দিতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে জমি দখল করে নেয়।
ভুক্তভোগী কহিনূর বেগম বলেন, ‘আমার বাবার ১৩০ শতাংশ জমি আছে। আমরা পাঁচ বোন ও এক ভাই। আমরা কোনো জমি বিক্রি করিনি। কিন্তু এমপি লতিফ ও তার গু-া বাহিনী মিলে আমাদের জমির দখল নেয়। আমরা সবাই মিলে মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় কয়েকবার লিখিত অভিযোগ করি। পুলিশ আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু তারা দখল ঠেকাতে পারে না। এসব জমির ওপর আমাদের সবার সংসার চলে। এটা আমাদের তিন ফসলি জমি।’
আরেকটি জমির মালিক আমির হোসেন বলেন, ‘উত্তর ইসলামপুর এলাকার আনোয়ার মুন্সী ওরফে ঠেলাগাড়ি আনোয়ার ও আলম মাদবরসহ আরও কয়েকজন মিলে আমাদের জমিগুলো দখল করিয়ে দেয়। থানায় গেলে পুলিশ বলে ওপরের নির্দেশ আছে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা কয়েকবার বাধা দিতে গিয়েছি। সেখানে ওদের পক্ষের লোকজন মিলে আমাদের মারধর করে আবার পুলিশ এনে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেয়। পুলিশ গিয়ে কেউ এখানে কাজ করতে পারবে না বলে আমাদের ফিরিয়ে আনে। পরে পুলিশের সহযোগিতায় তারা আমাদের জমিগুলো ভরাট করে আসছে।’
আরেক ভুক্তভোগী মো. আলী আকবর। তিনি বলেন, ‘আমার ৭০ শতাংশ জমি না জানিয়ে ভরাট করে ফেলছে। কয়েক দফা বাধা দিয়েছি। পুলিশ আমার পক্ষ না নিয়ে ওদের পক্ষ নেয়। আমার জমিতে আমি যেতে পারি না। আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দিয়েছে। বর্তমানে আমি জামিনে রয়েছি। জমিতে গেলে আমার বিরুদ্ধে পুলিশ লাগিয়ে দেয়। আমাকে এমপি লতিফ কয়েকবার ফোন করেছিলেন। তিনি আমাকে ভয়ভীতি দেখান। তার ছেলেও আমাকে ভয় দেখান।’
আরেক ভুক্তভোগী বছিরুন নেছা বলেন, ‘আমি খুব অসুস্থ। আমার জমির পরিমাণ ৬৫ শতাংশ। এই জমি আমার কাছ থেকে কোম্পানি (এমপি লতিফের শিপইয়ার্ড) কোনোভাবেই কিনে নেয়নি। তারপরও আমার জমি দখল করে নিয়েছে এমপি লতিফ ও তার গু-া বাহিনী। কারও কাছে বিচার পাচ্ছি না। আদালতে মামলা দিতে গেলে অনেক টাকা প্রয়োজন। আমরা কৃষক মানুষ, কোথা থেকে এত টাকা পাব। অনেকবার পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম, তারা আমাদের কথা শোনে না, এমপির কথা শোনে। আমাদের বলে চুপ করে বসে থাকেন।’
অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে গ্লোব শিপইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গেলে প্রজেক্ট ম্যানেজার যুবায়ের হোসেনকে নির্মাণাধীন একটি জাহাজের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষায় রেখে পরে আর তিনি দেখা করেননি। সংসদ সদস্য এমএ লতিফের জমি দেখভাল করে থাকেন আনোয়ার মুন্সী। জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। বালু ভরাট কাজ করছেন কাউন্সিলর মকবুল হোসেন।’
পরে কাউন্সিলর মকবুল হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে জেলার পুলিশ সুপার মো. আসলাম খান বলেন, ‘জমিজমাসংক্রান্ত ঝামেলা ভূমি অফিস অথবা জেলা প্রশাসন দেখে থাকে। তবে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোনো বিষয় থাকলে সেটা আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে দেখব।’
জমি দখল ও সড়ক নির্মাণে বালু ভরাটের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংসদ সদস্য এমএ লতিফের মোবাইল ফোনে একাধিকার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার ছোট ছেলে ওমর খৈয়ামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে আমি আমার বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। যারা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে তিনি তাদের বলেছেন, তোমাদের কাগজপত্র সঠিক থাকলে আমাদের কাছে নিয়ে আসো। তোমাদের হক আমরা মেরে খাব না। বাবা বলেছেন, স্থানীয় এক কাউন্সিলরের কথা হয়েছে। তাদের নিয়ে বসেন। আমরা আমাদের কাগজপত্র সঠিক রেখেই কাজ করেছি। আমাদের অনেক জমি কেনা আছে। আপনারা দেখেন, যাচাই-বাছাই করুন।’