`আমার ছোট্ট মেয়ের জানাজা আমাকে পড়াইতে হবে স্বপ্নেও ভাবি নাই'

নিষ্ঠুরতম এক ঘটনায় নিস্তব্ধ হয়ে গেছেন মাদ্রাসাশিক্ষক ও মসজিদের ইমাম জাহেদুল ইসলাম তালুকদার। জীবনে অনেক মানুষের জানাজা পড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু গতকাল সোমবার তিনি যার জানাজা পড়াচ্ছিলেন, সে ছিল তার একমাত্র মেয়ে আইনুর তাজফি।

জাহেদুল বললেন, বারবার চেষ্টা করেও আমার মুখ দিয়ে জানাজার নিয়ত, দোয়া আসতেছিল না। বাক্‌শক্তিহীন হয়ে পড়ছি। জীবনে অনেক মানুষের জানাজার নামাজ পড়াইছি। কিন্তু আমার ছোট্ট মেয়ের জানাজা আমাকে পড়াইতে হবে স্বপ্নেও ভাবি নাই। যখন মুসল্লিদের সামনে আমি জানাজার নিয়ত করতে যাই, তখন আমার মুখ দিয়ে কিছুই আসতেছিল না। দোয়াটা আমার মুখ দিয়ে আসতেছিল না। তিনবার করে আমাকে দোয়া পড়তে হয়।

মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জাহেদুল ইসলাম তালুকদার। তার বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নাজিরহাট পৌরসভার বেতুয়ারকুল গ্রামে।

সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্কুলের গেটে ঢোকার সময় জাহেদুলের মেয়ে আইনুর তাজফিকে চাপা দেয় একটি জিপ (চাঁদের গাড়ি)। এ ঘটনায় আইনুর ঘটনাস্থলেই মারা যায়। বেপরোয়া ওই চাঁদের গাড়িটি আইনুর ছাড়াও তিন শিক্ষার্থীকে পেছন থেকে চাপা দিয়েছিল। 

আহত অপর শিক্ষার্থীরা হলো মুফতারিন জাহান (৭), মায়শা মনি (৯) ও মেঘলা দেবী (৮)। তারা সবাই সুয়াবিল ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। নিহত আইনুরের দাদা ছিলেন ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা।

আইনুরদের ঘরের একটা টেবিলে এখনও ছড়িয়ে আছে আইনুরের খাতা, রংপেন্সিলের বক্স আর বই। একেকটি খাতায় আইনুরের আঁকা ছবি। 

আইনুরের মা ইসমত আরা একটা খাতা দেখিয়ে বললেন, দেখেন, কী সুন্দর হাতের লেখা আমার মেয়ের। ক্লাস থ্রির বাচ্চার হাতের লেখা কখনো এমন হয়? দেখলে মনে হবে কোনো কলেজে পড়ুয়া মেয়ের লেখা।

আইনুরের খাতা ধরে মা আর কিছু বলতে পারলেন না। মেয়ের কৃতিত্বের গর্ব নয়, বরং শোক তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন, কেউ একজন এসে তাকে ধরলেন।

দোতলা বাড়িটির সিঁড়িঘরটায় অনেকগুলো তাক। সেখানে আইনুরের খেলনা সাজানো। পুতুল থেকে শুরু করে খেলনার ডেকচি-পাতিল সবই যেন খেলনার মালিকের অপেক্ষায়।

জানা যায়, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত আইনুর কোনো ক্লাসেই দ্বিতীয় হয়নি। প্রতিটি ক্লাসেই প্রথম হয়েছে সে। রোল নম্বর ১ ছিল তার জন্য বরাদ্দ। স্কুলেও সব শিক্ষকের আদরের ছিল সে।

সুয়াবিল ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওসমান গণি বলেন, এত ভালো মেধাবী মেয়েটিকে এভাবে হারিয়ে আমরা শোকে পাথর। সে প্রতিটা শ্রেণিতে প্রথম হয়েছে। স্কুল এলাকায় চাঁদের গাড়ি চাপার ঘটনার বিচার চাই আমরা।

নাজিরহাটের সুয়াবিল ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পিচ ঢালা রাস্তায় রক্ত লেগে আছে। ঘাসের ওপর পড়ে রয়েছে আইনুরের একটি স্পঞ্জের স্যান্ডেল। পাশের একটি মাদ্রাসার মাঠে ঘাতক চাঁদের গাড়িটি পার্ক করা রয়েছে। আজ সেখানে মানুষের ভিড়। শিক্ষার্থীদের স্কুলের গেটে চাপা দেওয়ার বিষয়টি মানতে পারছেন না কেউ। ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও এলাকাবাসী এ ঘটনার দ্রুত বিচার চান।