রহে না রহে হাম
মেহেকা করেঙ্গে...
মুম্বাই নেমে কাল দুপুরে হোটেলের দিকে যেতে যেতে বান্দ্রা সি লিঙ্কের কাছে বিশাল ছবিটা নজরে পড়ল। প্রথমে মনে হয়েছিল ম্যুরাল। পরে জানলাম স্থানীয় অডিটরিয়ামের বাইরে তার পেইন্টিং।
দেখেই মনে হলো পাগলের মতো ক্রিকেটপ্রেমী এই মহিলাকে কভিড কেড়ে না নিলে সেমিফাইনাল ম্যাচের আগে নির্ঘাত প্রিভিউয়ের জন্য তার মন্তব্য নিতাম। শুনেছি ম্যানচেস্টারে নিউজিল্যান্ডের কাছে হারের পর একশো কোটি ভারতবাসীর মতো তিনিও ভেঙে পড়েছিলেন। চল্লিশ বছর আগে বিশ্বজয়ী কপিলের টিমের জন্য টাকা তুলে দিতে তার ভূমিকার কথা সবাই জানে। কিন্তু আমার মতো অনেকের কাছেই বোধহয় অজানা যে তিনি লতা মঙ্গেশকর দুর্দান্ত ছবি তুলতেন। ছবি তোলা শুরু করেন ১৯৪৬ সালে। আজীবন অব্যাহত ছিল সেই শখ। এদিন লতার নিজের বাছাই করা শ’খানেক ছবির সংগ্রহ নিয়ে সদ্যপ্রকাশিত ‘এন্ড সি ক্লিকড’ বইটা হাতে এলো। যার ভূমিকা লিখেছেন নরেন্দ্র মোদি।
বইতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ছবি আছে। লর্ডসের উল্টোদিকে তার ও রাজ সিং দুঙ্গারপুরের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে ১৯৭১-এর ভারত-ইংল্যান্ড লর্ডস টেস্ট শেষ হওয়ার পর মাঠের ভেতরকার অবস্থা। ছবিটা চমৎকার তুলেছিলেন সংগীতসম্রাজ্ঞী। কাতারে কাতারে মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে অভিজাত মাঠে খেলা শেষ হতেই মাঠে ঢুকে পড়েছে। যেমন তখনকার ইংল্যান্ডে ঢুকত। শুনেছি ওয়াংখেড়ে মাঠের উল্টোদিকেও যুগলের ফ্ল্যাট ছিল। জীবিত থাকলে দারুণ একটা ছবি এই ফ্ল্যাট থেকেও পেতেন যে ভরদুপুরে মেরিন ড্রাইভ থেকে উৎসাহী সত্তর-আশিজনের জটলা একটু পর পর স্টেডিয়ামের মেইন গেটের দিকে আসছে আর পুলিশ তাদের ক্রমাগত সরিয়ে যাচ্ছে। এত কম সিট ওয়াংখেড়েতে যে কালোবাজারে টিকিটের দাম দু আড়াই লাখে উঠে যাওয়া বিচিত্র নয়।
লতার কথা আরও মনে পড়ল তার স্মৃতিরক্ষার্থে নিমগ্ন পরিজনদের ইদানীং রিংটোনে একটা গান রাখার জন্য। সুচিত্রা সেনের লিপে...
রহে না রহে হাম / মেহেকা করেঙ্গে..
মতি নন্দীর একটা স্মরণীয় লাইন আছে গভীরভাবে কোনো ব্যক্তি বা টিমের ভাগ্যের সঙ্গে একাত্ম হলে বিপদের কথাই প্রথম মনে হয়। ওয়াংখেড়ে যেহেতু সেমিফাইনাল লোকেশন হিসেবে ভারতের কাছে খুবই ভয়াবহ। যেহেতু মাঠটায় তিনবার টিমকে সেমি ফাইনাল হারতে দেখেছি। তাই দোসরা এপ্রিলের অমর রাতও সেই করুণ রাগিণীকে ভুলিয়ে দিতে অসমর্থ।
রোহিত শর্মারা চলতি বিশ্বকাপে যা খেলেছেন তাতে শেষ দু ম্যাচে কোথাও অকস্মাৎ পা হড়কালেও গুনগুন গাওয়া উচিত, আমি থাকি কী না থাকি আমার গন্ধ-স্মৃতি থেকে যাবে। ৯টা ম্যাচে বিপক্ষকে দাঁড় করিয়ে হারিয়েছে। কী ক্রিকেট খেলেছেন এক একজন। সীমান্তের ওপার থেকে ওয়াসিম আকরামের প্রশংসাটা শুধু শুনবেন রোহিতের জন্য। টানা দুই বিশ্বকাপে পাঁচশোর ওপর রান করার মতো কৃতিত্বেই শুধু এই প্রশংসা ধেয়ে আসে না। কোনো ক্রিকেটার যখন নিজস্ব ক্রাফট নিয়ে চূড়ান্ত পারফেকশনে পৌঁছে যায় তখন এমন সব দুন্দুভি অজান্তেই বাজে তার জন্য। রোহিতের পুল শটের মূর্তি নিশ্চয়ই কোনো না কোনোদিন অন্তত তার আদত পাড়া বোরিভেলিতে বসবে। টানা দুটো বিশ্বকাপে তার এই অমুম্বই স্ট্রোক নিয়ে রোহিত যা গর্জন তুলেছেন তা ওয়াংখেড়েতে বহাল থাকলে চিন্তার কিছু নেই।
চিন্তা হলো যদি রোহিত-বিরাট দুজনেই ম্রিয়মাণ থাকেন। তখন সামলাবে কে? শুবমান গিল পারলে তারাদের ক্রমপর্যায়ে পরের লেভেলে উঠবেন। ক্রিকেট এদেশের এমন হৃদয় জুড়ে যে স্টার থেকে রাতারাতি হবেন আইকন। বিশ্বকাপে এ মাঠেই দুরন্ত ৯২ করেছেন। সেই ইনিংস এবং আউট হওয়ার পর সারা টেন্ডুলকারের বিষণœ মুখ দুটোই তো ভাইরাল।
দগদগে বাস্তব হলো ব্যাটিং প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়লে ছিটকে যেতে হবে। এখানে আইপিএলের মতো সেমিফাইনাল ব্যবস্থা নেই যে এক বা দুই নম্বর টিম গ্রুপ লিগে ভালো খেলার পুরস্কার হিসেবে একটা খারাপ দিনের প্রোটেকশন পায়। দ্বিতীয় সুযোগ পায় কোয়ালিফায়ারে। বিশ্বকাপ খেতাব এজন্য হয়তো ওয়ানডের মন্দার বাজারেও এত মায়াবী যে ফরম্যাট হিসেবে তা ক্ষমাহীন। আর তার চেয়েও ক্ষমাহীন ভারতীয় দর্শক। একটা বিপর্যয় এখন অবধি সম্রাট রোহিতকে রাতারাতি ফকির করে দেবে। কেউ মনেও রাখবে না গত ছয় সপ্তাহ ধরে কী অফুরন্ত বিনোদন তিনি ও সঙ্গীসাথীরা দিয়ে গিয়েছেন। বরং বলবে এতদিন যা হচ্ছিল সেটা আনুষ্ঠানিক। প্রভাবে বেকার। আসল খেলা তো এই বুধবার শুরু হলো। সেখানে পারফর্ম না করলে ধন্য ধন্য করব কেন?
চার বছর আগের হার তো শুধু নয়। ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালেও কেন উইলিয়ামসনরা হারিয়ে গিয়েছেন রোহিত-বিরাটদের। তার বদলা নিতে হবে। ধরা হচ্ছে প্রথম ১৫ ওভারে যদি একশো প্লাস করা যায় ভারত সেফ। রানটা তখনই সম্ভব যদি রোহিতের ব্যাট চলে। ব্যাটসম্যান হিসেবে তার নীল আকাশে ঘুড়ি নিয়ে উড়ে যাওয়ার মধ্যে ট্রেন্ট বোল্টকে তলোয়ার দিয়ে কাটাটাও রয়েছে। বাঁ-হাতি সিমারদের এই টুর্নামেন্টে পাওয়ার প্লে-তে যা মেরেছেন তারপর এই অতীতের টেকনিক্যাল ফুটো নিয়ে বিদ্রƒপের কোনো জায়গাই নেই। কিন্তু ক্রমাগত নিন্দা থেকে প্রশংসায় ফেরা অসামান্য জার্নিরও একটা নীরব রাজ্যাভিষেকের ব্যাপার থাকে। বুধবার এবং বোল্ট সেই মালা-চন্দন-প্রদীপ নিয়ে অপেক্ষায়। তারই সঙ্গে ছোবলেরও। যদি কোহলিকেও দ্রুত উপড়ে ভারতীয় অভিষেকের দিনটা টায়ার বিগড়ে দেওয়া যায়।
কুলদীপ যাদব আর একজন শাপভ্রষ্ট প্রতিভা মঞ্চারোহণের অপেক্ষায়। সেলিম খান ক্রিকেটের লোক না হয়েও যা বলছিলেন সত্যি তো। বিশ্বকাপে কুলদীপের চায়নাম্যান আদ্ধেক টিম বুঝতেই পারছে না। নিউজিল্যান্ড তাকে মিডল ওভারে মারতে চাইবে। জাদেজাকে মারা আরও কঠিন? কিন্তু সেখানেই কি তাদের মরণফাঁদ? চোরাবালির ব্যবস্থা? কুলদীপ সফল হলে ক্রিকেট মাঠে সেলিম-জাভেদের চিত্রনাট্যের মতোই নিপীড়িত অ্যাংরি ইয়ংম্যানের বাজি জেতার কাহিনি হবে। ভবিষ্যতে লোকে হয়তো জানবে কারা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিল? কেন কান ভারী করেছিল টিম ম্যানেজমেন্টের? কিন্তু টিম হারলে কেউ জানতেও চাইবে না যে একটা সময় রোহিতের ব্যক্তিগত অনুগ্রহের সম্মান চুকিয়ে কীভাবে অনবদ্য প্রত্যাবর্তন ঘটল তার?
ধরে নিতে পারি মিডল ওভারে তাকে আক্রমণের তীব্রতম উদ্যোগ নেবেন কেন উইলিয়ামসন নিজে। আচার-আচরণ-খেলার ভঙ্গি সব মিলে আধুনিক ক্রিকেটের স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেল তিনি। ধর্মশালায় প্রথম ব্যাট করেও যে নিউজিল্যান্ড ২৭৩ রানে থেমে গিয়েছিল সেই এগারোয় তিনি ছিলেন না। এখানে দুপুরে দেখছি দুজন স্থানীয় বাঁহাতি নিউজিল্যান্ড যেতে বল করে গেল। কুলদীপ-জাদেজার এর চেয়ে বড় প্রভাব আর কী হতে পারে যে সান্টনার টিমে থেকেও তাদের জুজুতে বাইরে থেকে বোলার আনতে হচ্ছে?
ওয়াংখেড়ের দগদগে সেমিফাইনাল-ইতিহাসকে যদি ইতিহাস দিয়ে কাটতে হয় সেটাও কিন্তু হাতের কাছে।
এই ১৫ নভেম্বরই তো শচিন টেন্ডুলকার নামক ঘোড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ময়দানে দৌড়াতে শুরু করে। ২৫ জুন যেমন ভারতীয় ক্রিকেটে শুভ দিন। ২ এপ্রিল যেমন ভোলা যাবে না। ১৫ নভেম্বরও তো তাই। শচিন-স্ট্যাচু নিয়ে একরাশ বিতর্ক। স্টিভ স্মিথের শট মনে হচ্ছে। এত বটম হ্যান্ডে ওই শট খেলা যায় না। মূর্তি উদ্বোধনে গাভাসকার-শাস্ত্রি-ভেংসরকাররা কেন আমন্ত্রিত হননি কত সব প্রশ্ন? শিবাজী পার্কে ঢুকে মনে হলো এখানেও কি একটা ফলক অন্তত লাগানো যেত না? এই মাঠ মানে তো মুম্বাই ক্রিকেট এবং তিনি! সেই কীর্তিকে সম্মান জানাতে পারে না মুম্বাই পুরসভা?
২০১৯’র ১০ জুলাই সুনিল গাভাসকারের সত্তরতম জন্মদিনের রং বিবর্ণ করে দিয়েছিল ব্ল্যাক ক্যাপেরা। ওল্ড ট্রাফোর্ডের অঘটনে। শচিনের আবির্ভাব দিবসের চৌত্রিশতম বর্ষ পূর্তিতে আবার কালো রং? মনে হয় না। চাপে ধস্ত না থাকলে রোহিতের টিম এবার ভারতীয় ক্রিকেটের পুণ্য দিনে ইতিহাসকে ঘোরাবে।