প্রফেসর হজরত (রহ.) যেমন ছিলেন

একজন মানুষ আমার জীবনটা আমূল বদলে দিয়েছিলেন। টেনে নিয়ে গেছেন পঙ্কিল জগৎ থেকে ইসলামের পথে। কখনো হাত ধরে, কখনো শাসন করে। নতুন জগতের কিছুই জানা ছিল না। কোরআন মাজিদ পড়া থেকে শুরু করে প্রতি পদে পদে সুন্নতের অনুশীলন করিয়েছেন। সত্য-সুন্দরের দিকে প্রতিনিয়ত ডেকেছেন। বড় ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। কেবল ধার্মিকতার জন্য তিনি হয়তো এত প্রিয় হতেন না কখনো। তার ছিল অনিন্দ্য সুন্দর এক আখলাক। যে একবার তার কাছে গিয়েছে, পুরো জীবনে সেই সান্নিধ্যের ছোঁয়া আর ভুলতে পারেনি। আর যারা ছায়ার মতো লেগেছিল, তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে লেপ্টে আছেন তিনি। মনে হয়, তার সান্নিধ্য না পেলে অন্ধকারেই মিশে যেত এই জীবন। তিনি ছিলেন প্রফেসর হজরত মুহাম্মাদ হামীদুর রহমান রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ২ নভেম্বর (২০২৩) এই নশ্বর দুনিয়া ছেড়ে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।

নেভির জীবন থেকে বুয়েটে এসেছিলাম সেই ১৯৯০ সালে। তারপর কেটে গেছে আরও চার বছর। এত কাছে থেকেও সন্ধান মেলেনি মানুষটির। তখন যে জগৎই ছিল ভিন্ন! টিএসসিতে কবিতা আবৃত্তি আর মার্শাল আর্টে ডুবে থেকে সময় যেত। টেলিভিশনে নেভির অনুষ্ঠানে সজাগ উপস্থিতি; আরও কত কী! এর মধ্যে আল্লাহতায়ালা কুদরতিভাবে এই মানুষটির সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। তারপর আমৃত্যু আর তার সঙ্গ ছাড়িনি- আলহামদুলিল্লাহ।

প্রফেসর হজরত সব কাজ করেছেন দয়াময় আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য। কখনো কারও থেকে কোনো বিনিময় আশা করেননি। মানুষের মধ্যে কেবল ভালো দিকটাই দেখেছেন। কোরআন-পাগল ছিলেন, বয়ান-বৈঠকে কোরআনের আয়াত ছাড়া কোনো আলোচনা হতো না। সুন্নতের খেলাফ কিছু করার চেষ্টা করেননি। এমন মানুষ সবাইকে টপকে যাবেন এই তো স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক পরিণতিই তাকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে। তার তাকওয়া-পরহেজগারি কিংবদন্তির পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তিনি যেমন ভালোবেসেছেন, তেমনি লোকজনও তাকে পাগলের মতো ভালোবেসেছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ভালোবাসার কথাই বলেছেন। মানুষের প্রতি এরকম ভালোবাসাই আখেরাতে কাজে আসবে; সেখানেও তার ভালোবাসার মানুষের সান্নিধ্য মিলবে!

তিনি মানুষের কাছ থেকে কখনো কোনো কিছু আশা করতেন না। তাকে প্রকাশ্যে কখনো কোনো হাদিয়া গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। হাদিয়া দেওয়ার কারণে কারও প্রতি বিশেষ আচরণেরও দৃষ্টান্ত নেই। তার বক্তব্য ছিল, ‘হাদিয়া কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দেওয়া উচিত।’ যারা হাদিয়া দিত, তিনি তাদের ক্ষেত্রে একই ধারণা রাখতেন। এজন্য দেখা যেত, কারও হাদিয়া গ্রহণ করা হলেই হাদিয়াদাতা খুশি হয়ে যেতেন। এর বাইরে হজরতের কাছে তাদের অন্য কোনো প্রত্যাশা থাকত না। যারা ভিন্ন কিছু আশা করত, হজরত সেটি বুঝতে পারতেন এবং তার হাদিয়া গ্রহণ করতেন না। এ ব্যাপারে ছিল তার আশ্চর্য দূরদর্শিতা!

তিনি প্রচুর খরচ করতেন। এত টাকা কোত্থেকে আসত? এই প্রশ্ন অজানাই থেকে গেছে শেষ সময় পর্যন্ত। তবে যা দেখেছি, তা হচ্ছে, তিনি অনেক ধারকর্জ করতেন। ধারকর্জ করে মানুষের জন্য খরচ করতেন। মক্তব-মাদ্রাসা চালাতেন। আবার সেগুলো শোধ করে দিতেন। নিজে সাদাসিধে জীবনযাপন করেছেন, কিন্তু মানুষের জন্য রাজকীয় ব্যবস্থাপনা করতে চাইতেন। যা পেরেছেন, করে গিয়েছেন। অকাতরে আলেমদের খেদমতে খরচ করেছেন। টাকা ছিল তার কাছে কাগজের মতো। একবার কোনো রিকশায় চড়লে সেই রিকশাওয়ালা ভাই আবার কবে এমন প্যাসেঞ্জার পাবে, এ আশায় থাকত। তার মধ্যে কোনো লোভ ছিল না। এর অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। কলেবর বৃদ্ধির কারণে সেদিকে যাচ্ছি না।

তিনি বড় বড় প্যান্ডেল সাজিয়ে শানদার মাহফিল থেকে ঘরোয়া মাহফিলে আগ্রহী ছিলেন বেশি। তিনি এর প্রতি জোর দিতেন। তিনি বলতেন, ‘অনেক বড় বড় প্যান্ডেলঘেরা মাহফিলের চেয়ে ঘরোয়া মাহফিলের প্রভাব বেশি।’ এসব মাহফিলে স্বল্পসংখ্যক শ্রোতার উপস্থিতি নিয়ে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেননি। বরং বলেছেন, ‘আল্লাহ কি শ্রোতার সংখ্যা দেখে সওয়াব দেবেন? তিনি তো বান্দার ইখলাসের কারণে সওয়াব ও বরকত দান করেন।’

মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, তাদের পারিবারিক সমস্যা বাড়ছে। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির কারণে এটি এখন মহামারীর আকার ধারণ করেছে। অথচ বাইরে থেকে এর কিছুই বোঝা যায় না। প্রতিটি মানুষই আলাদা এবং তাদের সমস্যার ধরনও ভিন্ন। সব ভালোর মধ্যেও সামান্য বিষয় নিয়ে অনেক পরিবারে তুলকালাম কা- ঘটে যায়। হজরত যে কত শত পরিবারের সমস্যা মিটিয়েছেন, আল্লাহই ভালো জানেন। তার অসিলায় কত পরিবার যে টিকে গেছে, ভাঙা সংসার জোড়া লেগেছে, তার হিসাব নেই। জানা যায়, তিনি অনেক হিন্দু পরিবারের ক্ষেত্রেও এই কাজ করেছেন। তাকে বলা হলো, ওরা তো হিন্দু। হজরত বলতেন, ‘তারা কি মানুষ নয়? হয়তো আমার এ আচরণের কারণে তারা মুসলিম হয়ে যাবে।’ তিনি সব মানুষের কল্যাণ কামনা করতেন। কারও প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখতেন না। কাউকে দূরে সরিয়ে দিতেন না। তার সদাচরণ ছিল সত্যি অসাধারণ!

হজরত ছিলেন প্রচ- মেধাবী। স্মরণশক্তি ছিল প্রখর। একবার কোনো কিছু শুনলে আর ভুলতেন না। হয়তো কেউ প্রথম এসে হজরতকে তার সন্তানদের খবর জানিয়েছে। পরে ওই ব্যক্তি এলে হজরত তাকে তার ছেলের নাম ধরে বলতেন, ‘অমুকের বাবা, কেমন আছ?’ এতে ব্যক্তিটি অবাক না হয়ে পারত না। এমন ভালোবাসার মানুষ সহজে মিলে না। এ ছাড়া অতীতের কোনো ঘটনার দিন-তারিখসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গের নামও বলতে পারতেন। তিনি যদি লিখতেন, তাহলে আরেকটি ‘আপবীতী’ হয়ে যেত। তিনি কখনোই লেখায় আগ্রহী ছিলেন না। নিজের জীবনী, বয়ান কিংবা মালফুযাত লেখা হোক, এটাও আশা করতেন না। আল্লাহ চেয়েছেন, তার অনেক বয়ান ও মালফুযাত এবং সফরনামাও সংরক্ষিত হয়েছে। এসব বই পড়লে তাকে চেনা কিছুটা সহজ হবে। আল্লাহতায়ালা তার সান্নিধ্যে প্রায় ত্রিশ বছর কাটানোর সৌভাগ্য দিয়েছেন। সব তো আর লেখা যায়নি। দেখাও হয়নি। তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন।

প্রফেসর হজরত (রহ.) এক অসাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। সুন্নতের অনুসরণ-অনুকরণে তার জীবনের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। কোনো কিছুর বিশালতাকে ধারণ করতে না পারলে এর যথাযথ বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। আমার সেই যোগ্যতা নেই। আল্লাহ তার সব কাজকে কবুল করুন। তার কবরকে নূরে ভরে দেন। তার ফয়েজ ও বরকতকে কেয়ামত পর্যন্ত চালু রাখুন। আমিন।