জিলহজের কিছু আমল ও ফজিলত

আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ১১:৪৬ এএম

হিজরী সনের সর্বশেষ মাস জিলহজ। এটি হজ ও কুরবানীর মাস। ইসলামী শরীয়তে অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ মাস এটি। কুরআনে কারীমের সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে চার মাসকে সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন মাহে যিলহজ তার অন্যতম। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন।

সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছে, আসমান-জমিনের সৃষ্টির সময় যেমন ছিল। (কারণ, জাহেলী যুগে আরবরা নিজেদের স্বার্থ ও মর্জিমত মাস-বছরের হিসাব কমবেশি ও আগপিছ করে রেখেছিল।) বার মাসে এক বছর। এর মধ্য থেকে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিক- যিলকদ, যিলহজ ও মুহাররম। আরেকটি হল রজব, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস। সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৬৬২

হজ ও কুরবানী ইসলামের স্বতন্ত্র দুটি মৌলিক ইবাদত। ইবাদতদুটি ‘মিন শাআইরিল্লাহ’ তথা ইসলামের পরিচয়-চিহ্ন বহনকারী দুটি প্রতীক। ইবাদতদুটি সংঘটিত হয় এ মাসে। আর হজের দিকে সম্বন্ধিত করেই তো এ মাসের নামকরণ হয়েছে যুলহিজ্জাহ-হজের মাস! যেহেতু হজ ও কুরবানী স্বতন্ত্র দুটি ইবাদত তাই এর জন্য রয়েছে স্বতন্ত্র ফযীলত, স্বতন্ত্র বিধান। আলাদা গুরুত্ব ও পৃথক মর্যাদা। যা ভিন্নভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

এ মাসের ফযীলতপূর্ণ দিবসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আশারায়ে জিলহজ্ব’ তথা যিলহজ্বের প্রথম দশক। কুরআন মাজীদের সূরা ফাজরে আল্লাহ তাআলা যে দশ রজনীর শপথ করেছেন, সেই ‘দশ’ হল জিলহজের এই প্রথম দশক। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হযরত ইবনে যুবাইর (রা.) ও মুজাহিদ (রাহ.) সহ পূর্ববর্তী-পরবর্তী অনেক মুফাসসির এ মতই ব্যক্ত করেছেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা ফাজর-এর তাফসীর দ্রষ্টব্য)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দশকের ব্যাপারে ইরশাদ করেন-

আল্লাহর নিকট জিলহজের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৮; সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৬৯; জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭২৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৯৬৮

বিশেষ করে এ দশদিনের মাঝে রয়েছে ইয়াওমে আরাফা। অর্থাৎ জিলহজ মাসের নবম তারিখ। এই দিনে হাজী ছাহেবান আরাফার ময়দানে উকূফ (অবস্থান) করেন। পবিত্র হজ পালনের একটি ফরয বিধান হচ্ছে এই দিনে ‘উকূফে আরাফা’ তথা আরাফায় অবস্থান করা। হজের মূল দিন হচ্ছে জিলহজের ৯ তারিখ ‘ইয়াওমে আরাফা’।

এদিনে বান্দার দিকে রবের রহমতের জোয়ার প্রবলবেগে ধাবিত হয়। অসংখ্য বান্দাকে তিনি এ দিনে ক্ষমা করে দেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন।

আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৪৮

তাছাড়া এ মাসের যে দিনটি বিশেষ তাৎপর্য ধারণ করে তা হচ্ছে জিলহজের ১০ তারিখ। হাদীসের ভাষায় ‘ইয়াওমুন নাহর’। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনের ব্যাপারে বলেন-

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার কাছে সবচেয়ে মহিমান্বিত দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমুন নাহর’তথা কুরবানীর দিন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৭৬৫

আল্লাহ তাআলা এ দিনটিকে মুসলমানের জন্য ঈদ সাব্যস্ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহা’র আদেশ করা হয়েছে (অর্থাৎ এ দিনে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে); এ দিবসকে আল্লাহ তাআলা এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬৫৭৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯১৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৫

অতএব আশারায়ে জিলহজ, হজ, কুরবানী, ইয়াওমে আরাফা, আইয়ামে তাশরীক প্রভৃতিসমূহ কল্যাণে বেষ্টিত একটি মাস যিলহজ মাস। কাজেই এ মাসের খায়ের ও বরকত হাছিল করার ব্যাপারে মুমিন সজাগ-সতর্ক থাকে। আমলে আমলে, নেকী ও কল্যাণের মাধ্যমে এ মাসের বরকতময় দিনগুলোকে প্রাণবন্ত রাখার মাঝেই সে সফলতা খুঁজে পায়।

এ মাসের কিছু আমল

আল্লাহ তাআলার নিকট আশারায়ে জিলহজের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদু লিল্লাহ’ পাঠ কর। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৫৪৪৬; আদদাআওয়াতুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ৫৩৪

এ দিনগুলোতে মনোযোগী হই রোযার প্রতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজের প্রথম নয় দিন রোযা রাখার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন। বর্ণিত হয়েছে-

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজের ৯টি দিবসে (সাধারণত) রোযা রাখতেন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৩৩৪; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ৮৩৯৩

বিশেষ করে ৯ তারিখ ‘ইয়াওমে আরাফা’কে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া চাই। এদিন অতিবাহিত করি দুআ-দরূদ, কান্নাকাটি ও তাওবা-ইস্তিগফারে। ইহতিমাম করি এ দিনে রোযা রাখার প্রতি। স্মরণ রাখি নবীজীর হাদীস-

আরাফার দিনের (নয় জিলহজের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি, তিনি পূর্বের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২

যখন জিলহজের চাঁদ দেখবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানী করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫২৩

জিলহজ মাস হচ্ছে হজ ও কুরবানী আদায়ের মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাদেরকে এ নেক আমল আদায়ের তাওফীক দিয়েছেন গুরুত্বের সঙ্গে তারা ইবাদতদুটি পালনের প্রতি যত্নবান হই এবং ইখলাসের সাথে তা করতে চেষ্টা করি। শয়তান বহুভাবে বান্দার আমলের রূহ নষ্ট করে দেওয়ার পাঁয়তারায় থাকে। কোনোভাবেই তাকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য কীভাবে আমার আমলগুলো নিবেদিত হতে পারে সেদিকে পূর্ণ মনোযোগী হওয়া দরকার।

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে নিয়ে তের জিলহজ আসর পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরয নামাযের পর নারী-পুরুষ সকলের জন্য একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। তাকবীরে তাশরীক হল-

اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لَا إِلهَ إِلّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، وَلِلهِ الْحَمْدُ.

সর্বমোট পাঁচ দিন তাকবীরে তাশরীক বলা হলেও পরিভাষায় সাধারণত এগার বার ও তের জিলহজকে আইয়ামে তাশরীক বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

আইয়ামে তাশরীক হল পানাহার ও আল্লাহর যিকিরের জন্য। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০৭২২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৪১

অতএব আমরা এ দিনগুলোতে যিকির ও তাকবীর পাঠের খুব ইহতিমাম করব।

হাদীসে বলা হয়েছে, এ দিনগুলো পানাহারের দিন (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৪১)। সহীহ মুসলিমে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে ‘আইয়ামে তাশরীকে রোযা রাখা হারাম’ অধ্যায়ে। এ হিসাবে জিলহজের ১০ তারিখ থেকে তের তারিখ পর্যন্ত রোযা রাখা হারাম।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জিলহজের গুরুত্ব অনুধাবন করে ইবাদতে ইবাদতে তা ফলপ্রসূ করার তাওফীক নসীব করুন। আমিন  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত