দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর বিএনপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবি আদায়ে আন্দোলনে
থাকলে দলটিকে বিজয়ী হতে হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, এ সিদ্ধান্তেও আসতে হবে বিএনপিকে।
এ ছাড়া দলে মোটা দাগে ভাঙন না ধরলেও মধ্য ও নিচের সারির নেতা এবং তৃণমূলের কর্মীদের ধরে রাখারও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আন্দোলন জোরদার করতে গ্রেপ্তার এড়িয়ে রাজপথে থাকাও দলটির জন্য চ্যালেঞ্জ মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে এবং দলের ভেতর এ বিষয় আলোচনা আছে। সে ক্ষেত্রে নতুন কী ধরনের কর্মসূচি দেওয়া যায়, সেটাও ভাবছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এক দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গত ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ এবং পরবর্তী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বিএনপি। তাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সমমনা দলগুলো একই ধরনের কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। এসব কর্মসূচি ঘিরে সহিংসতার ঘটনাও আছে। পাশাপাশি ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী এখন কারাগারে।
তফসিল ঘোষণার আগে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র নিঃশর্ত সংলাপ চেয়ে বিএনপিসহ তিন দলকে চিঠি দেয়। কিন্তু দলটি সমঝোতায় আসার বিষয়ে এখনো ইতিবাচক কিছু জানায়নি।
সম্প্রতি দলের বহিষ্কৃত ও বর্তমানে নেতাদের কয়েকজন নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে নতুন দলের যোগ দিয়েছেন, কিংবা নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠন করছেন। যারা এ তৎপরতার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ভয় রয়েছে। কারণ বিএনপি নির্বাচনপন্থি দল হিসেবে নেতাকর্মীরা আশা করেন দল একদিন না একদিন ক্ষমতায় আসবে। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় নেতাকর্মীদের মনোবলে চিড় ধরতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, দলটি জন্মলগ্ন থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সামনে এগিয়েছে। আগামীতেও একইভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাবে।
গত বুধবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য খন্দকার আহসান হাবিবের নেতৃত্বে ‘স্বতন্ত্র গণতন্ত্র মঞ্চ’ নামে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছেন নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার এ কে এম ফখরুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনের পর বিএনপি থেকে তাদের দুজনকে বহিষ্কার করা হয়।
এর আগে তৃণমূল বিএনপি নামে নতুন নিবন্ধিত দলে যোগ দেন বিএনপির সাবেক নেতা শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমূর আলম খন্দকার। তাদের সঙ্গে বিএনপির কিছু নেতাও রয়েছেন বলে তারা দাবি করেছেন।
বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার দলের নেতাদের লোভ দেখিয়ে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে দল থেকে বহিষ্কৃত, দীর্ঘদিন ধরে পদবঞ্চিত কিংবা কার্যক্রমে অংশ না নেওয়া নেতাদের সরকার নিতে পারবে, তাতে বিএনপির ক্ষতি হবে না।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এবং দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনমুখী দল এবং বিভিন্ন সময় জনগণের ভোটে ক্ষমতায় গেছে। দেশের জনগণ গত দুটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিএনপি আন্দোলন করছে। কিন্তু সরকার জনদাবি উপেক্ষা করে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পথে না হেঁটে একতরফা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। দেশ ও দেশের জনগণকে কঠিন সংকটের মুখে ফেলতে যাচ্ছে।’ তিনি বিশ^াস করেন, বিএনপির পরীক্ষিত নেতারা সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। বরং সরকারের লোভে পড়ে যারা সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবেন, তারা আরও বেশি জনবিচ্ছিন্ন হবেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, বিএনপি সবসময় শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করেছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সারা দেশের অসংখ্য নেতাকর্মীকে কারাগারে নিয়েছে। কিন্তু তারপরও বিএনপি শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে।
বিএনপির চলমান আন্দোলনে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা এমনকি জেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতাদের অনেকে রাজপথে নামছেন না। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে রাজপথে নামছেন। যার কারণে আন্দোলন বেগবান হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আন্দোলনের সফলতা আদৌ আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জাহিদ বলেন, ‘রাজপথে নামার পরিবেশ তো সরকার রাখেনি। কার্যালয় পর্যন্ত দখল করে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।’ তবে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে শিগগিরই বেশিরভাগ নেতাকর্মী রাজপথে নামবেন এবং আন্দোলন সফল হবে বলে মনে করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক যুগ্ম মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী ৯ বছর আন্দোলন করেছে বিএনপি। তখন নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এরশাদের পতনের পর যে নির্বাচন হয়েছে, তাতে বিএনপি জয়লাভ করেছে। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এবার নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন না হলে বিএনপি সে নির্বাচনে যাবে না।’