বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তির আশা

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগারীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সংস্থার দুদিনব্যাপী সম্মেলনে বিশ^ বাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও) সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছে সদস্য রাষ্ট্রগুলো। সম্মেলনের পাশর্^রেখায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক এপেক সম্মেলনের আলো অনেকটা কেড়ে নিলেও ডাব্লিউটিও সংস্কারের ওপর একমত হওয়াকে ২১ সদস্যবিশিষ্ট এপেকের সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনই বলা হচ্ছে। তবে ইউক্রেন ও গাজার যুদ্ধ নিয়ে দেশগুলো ঐকমত্য পোষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে সদস্যরা। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডাব্লিউটিওর বেশ কিছু প্রক্রিয়া ও অনুশীলন নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই বিরোধ দেখা যাচ্ছিল। এই জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রধান তিন শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। তিন দেশের প্রতিনিধিত্বকারী মতামতসহ বৈশি^ক বাণিজ্যের কার্যপ্রণালী নিয়ে একমত হওয়াটা বেশ বড় অর্জন।

এপেক সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে ১৬৪ সদস্য নিয়ে গঠিত ডাব্লিউটিওর তরফ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে আসা উদ্বেগকে ভিত্তি করে সদস্য দেশগুলো সংস্থাটির সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আলাপ শুরু করেছে এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধ কাটাতে এটির সমাধান জরুরি। এ সংক্রান্ত বিরোধ সমাধান করতে একটি খসড়া প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে।

খসড় প্রস্তাব সম্পর্কে বলা হয়, বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতে ভেঙে যাওয়া ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া বিরোধ সমাধানের সময়সীমা এবং ভিন্নমত পোষণকারী দেশকে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে ডাব্লিউটিও-সংক্রান্ত যাবতীয় আলোচনার মূল বিষয়টি নিহিত হয়েছে ‘আপিল বডিতে’ যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বিরোধী মীমাংসা করে থাকে। এপেক সম্মেলনে এর সংস্কার প্রস্তাবে সবাই একমত হয়েছে। তবে এই কাঠামোর পুনরুজ্জীবন করা হবে কি না তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট বক্তব্য আসেনি। একে বিচারিক কাঠামোকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আপিল বডি ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে থমকে রয়েছে। বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রই এর কার্যক্রমকে অচল করে দেয়। এর পর থেকে সদস্য দেশগুলো একটি অধস্তন সংস্থার কাছে অভিযোগ জমা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সংস্থায় গ্রহণ করা না হলে তা রীতিমতো জটলা হয়ে যায়। বর্তমানে আপিল বডিতে সমাধানের জন্য ৩০টির মতো অভিযোগ সুরাহার অপেক্ষায় রয়েছে। দেশগুলো চাইছে, এই অচলাবস্থার অবসান হোক।

সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে সদস্য দেশগুলোর তরফ থেকে অচলাবস্থা কাটানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। এ নিয়ে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুং বলেন, ডাব্লিউটিওর বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থা শিগগিরই পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এ সময় তিনি ডাব্লিউটিও সংস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সংস্কার দাবি করেন। সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় সমন্বয়কারী কর্মকর্তা মাকো মোলিনা আবুধাবির বৈঠককে চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আগামী বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন রয়েছে। সেই কারণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ব্যাপারটি শীতল হয়ে যেতে পারে। মার্কিন নির্বাচনে বাণিজ্য সব সময়ই বড় ইস্যু।’ এপেকের নেতারা সানফ্রান্সিকো সম্মেলনের পর যৌথ বিবৃতিতে বলেন, জোটের নেতারা ‘অবাধ, মুক্ত, স্বচ্ছ, অ- বৈষম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রত্যাশিত বাণিজ্য বিনিয়োগের নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা ২০২৪ সালের মধ্যে সদস্য দেশগুলোর জন্য গ্রহণযোগ্য বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থার পূর্ণ ও সুসংগঠিত কাঠামো তৈরিসহ ডাব্লিউটিওর কার্যপ্রণালীর সব দিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনায় করতে চাই।’

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, নিজেদের বিচারক না থাকায় অনেক বাণিজ্য বিরোধে যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে একজন বিচারকের পুনর্নিয়োগ আটকে দেয় ওয়াশিংটন।