দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে আবার জাতীয় পার্টিতে (জাপা) রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হলেন রওশন এরশাদ। তিনি চাইছেন জোটগতভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচন করতে এবং তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে পার্টির সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু রওশনের সিদ্ধান্তে একমত নন জাতীয় পার্টির সভাপতি জিএম কাদের। এই অংশের সিদ্ধান্ত, নির্বাচনে অংশ নিতে হলে এককভাবেই অংশ নেবেন তারা। তবে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, তা আজ-কালের মধ্যেই জানাবেন কাদেরপন্থিরা।
গতকাল ইসিকে দেওয়া চিঠিতে জাতীয় পার্টি ‘মহাজোট’ থেকে নির্বাচনে অংশ নেবে এবং প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক লাঙ্গল বা প্রার্থীর ইচ্ছানুযায়ী জোটবদ্ধ হয়েও নির্বাচন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন রওশন এরশাদ। কিন্তু রওশন এরশাদের এই সিদ্ধান্তও কঠোরভাবে নাকচ করে দিয়েছেন কাদেরপন্থিরা। এই অংশের নেতারা জানিয়েছেন, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রওশন এরশাদের নেই। এমনকি দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রওশন এরশাদ দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন না।
এমন অবস্থায় জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, অংশ নিলেও কোন প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে, দলীয় মনোনয়ন কে দেবেন এবং দলীয় প্রতীক কোন অংশ পাবে, সে নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হলো।
ইসিতে রওশনের চিঠি দেওয়ার বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে উনি (রওশন এরশাদ) আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তার চিঠি দেওয়ার এখতিয়ারও নেই। উনি কেন দিয়েছেন, জানি না। এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ওই চিঠির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’
আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটের হয়ে নির্বাচন করার ব্যাপারে রওশন এরশাদের সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘উনি বলেছেন মহাজোটের সঙ্গে নির্বাচন করবেন। কিন্তু জাতীয় পার্টি এখন কোনো মহাজোটে নেই। এখনো জাতীয় পার্টি নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। যদি আমরা নির্বাচন করি তাহলে এককভাবেই করব।’
এমনকি দলীয় প্রতীক লাঙ্গল বরাদ্দ বা দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারেও রওশন এরশাদের কোনো এখতিয়ার নেই বলেও জানিয়েছেন মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতীক বা দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে রওশন এরশাদের বলার বা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই।
এদিকে রওশন এরশাদ দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেছেন, তিনি ইসিতে চিঠি দেননি।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে রওশন এরশাদকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো চিঠি পাঠাইনি। আমি চিঠির বিষয়ে কিছু জানি না।’
রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির মুখপাত্র কাজী মামুনুর রশিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ফোরামে সিদ্ধান্ত হয়েছে জাপা নির্বাচনে অংশ নেবে এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকেই নির্বাচন করবে। এ ব্যাপারে কাদের সাহেব (জিএম কাদের) কী করবেন, তা বলতে পারব না। আশা করছি কাদের নির্বাচনে আসবেন, না এলে কাদের সাহেব ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন।’
মনোনয়ন কে দেবেন বা দলীয় প্রতীক কারা পাবেন, নাকি রওশন ও কাদেরপন্থিরা সমঝোতার ভিত্তিতে একসঙ্গে নির্বাচনে যাবেন এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘মনোনয়ন রওশন এরশাদ দেবেন। তবে ক্ষমতাবলে কাদের সাহেবের মতামত নেওয়া হবে। সামনে অনেক খেলা আছে। ইনশা আল্লাহ সামনে দেখতে পাবেন।’
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ৩০ নভেম্বর, মনোনয়নপত্র বাছাই ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৭ ডিসেম্বর। ভোটগ্রহণ হবে ৭ জানুয়ারি।
চলছে দর-কষাকষি : জাতীয় পার্টি দুপক্ষের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলটি নির্বাচনে যাবে, তা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছে। তবে কার নেতৃত্বে ও কীভাবে অংশ নেবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
জাতীয় পার্টির কাদেরপন্থি অংশের নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে কিছু দাবি-দাওয়া আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আসনছাড়। আসন ছাড় দিলে আওয়ামী লীগ কোনো প্রার্থী দিতে পারবে না। এমনকি নির্বাচনে জয়লাভ করলে জাতীয় পার্টি থেকে একাধিক মন্ত্রী করতে হবে এবং জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ দিতে হবে। তবে এখনো এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো সবুজসংকেত আসেনি বলেও জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির নেতারা।
অন্যদিকে, রওশনপন্থি নেতারা জানিয়েছেন, এবার দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নের ক্ষমতা রওশন এরশাদ পাচ্ছেন না। এটা আঁচ করতে পেরেই রওশন এরশাদ চিঠিতে প্রার্থীর ইচ্ছানুসারে মহাজোটের সঙ্গে নির্বাচনের অংশটি রেখেছেন। এ জন্য আওয়ামী লীগের কাছে আসনছাড়ও চেয়েছেন তিনি। এসব আসনে তিনি মনোনয়ন দিতে চান।
এই অংশের নেতারা আরও বলেছেন, রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের এক হয়ে এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তবে জাপার সর্বশেষ কাউন্সিলের মেয়াদ এ বছরের ২৯ জানুয়ারি শেষ হয়ে যাওয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় প্রতীক কাদেরপন্থিরা না-ও পেতে পারেন বলে মনে করছেন এই অংশের নেতারা।
জাতীয় পার্টির নেতারা আরও জানান, আসন সমঝোতার জন্য দু-এক দিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন কাদেরপন্থি নেতারা। সরকারি দলের সঙ্গে জিএম কাদের, মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু এবং সিনিয়র কো-চেয়ারম্যানরা বৈঠকে অংশ নিতে পারেন। তবে সরকারি দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে বৈঠকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদকে নিতে চাইছেন না তারা। তিনি দলের সাংগঠনিক কোনো পদে না থাকার কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দর-কষাকষিতে রাখতে চাইছেন না। নির্বাচনী প্রসঙ্গ নিয়ে দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের সঙ্গে রওশন এরশাদ বৈঠক করতে পারেন বলেও নেতারা জানিয়েছেন।
চুন্নুর ভিডিও বার্তা : জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে কি না তা দু-এক দিনের মধ্যেই জানা যাবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু। গতকাল এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে যৌথসভা শেষে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। এখন পর্যন্ত সংলাপের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিএনপিও সংলাপের বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেনি। সরকারি দল ডায়ালগের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে। এ রকম একটা অবস্থায় আমাদের দল নির্বাচনে যাবে কি না সে প্রশ্নটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা দু-এক দিনের মধ্যে সিনিয়র নেতাদের নিয়ে, প্রয়োজনে প্রেসিডিয়ামের মিটিং ডেকে, আলোচনা করে নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট দলীয় সিদ্ধান্ত নেব।’
আজ বঙ্গভবনে যাচ্ছেন রওশন : রওশন এরশাদ আজ রবিবার বঙ্গভবনে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তার অনুসারী এক নেতা। তিনি জানান, রওশন এরশাদ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হবেন। তাছাড়া নির্বাচনী ইস্যু নিয়ে যেকোনো দিন যেকোনো সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করবেন তিনি। তারপরই জানা যাবে রওশন এরশাদ এককভাবে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন দেবেন নাকি জিএম কাদেরকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করবেন।
গত সপ্তাহে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।