নিষিদ্ধ সনদে স্ত্রীর এমপিওভুক্তি

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান। গত বছর সেপ্টেম্বরে একই উপজেলার বুড়িচং কালীনারায়ণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তার স্ত্রী খন্দকার উম্মে সালমা। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদে এমপিওভুক্তি (মাসিক বেতনের সরকারি অংশ) বন্ধ থাকার পরও স্বামীর প্রভাবে এই নিয়োগ পান তিনি। আর এমপিওভুক্তির জন্য সনদ যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার। অবৈধ সনদে স্ত্রীকে এমপিওভুক্তির সুপারিশও করেন আব্দুল মান্নান। যার ধারাবাহিকতায় গত বছর নভেম্বরেই সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হন খন্দকার উম্মে সালমা। এরপর থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতাও উত্তোলন করছেন।

জানা গেছে, বুড়িচং কালীনারায়ণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে গত বছর ১ সেপ্টেম্বর সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে তিনজন প্রার্থী অংশ নেন। তার মধ্যে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম দেখানো হয় খন্দকার উম্মে সালমাকে। তিনি ২০ সেপ্টেম্বর নিয়োগপত্র পান এবং ২৯ সেপ্টেম্বর যোগদান করেন। লিখিত পরীক্ষায় দুজন প্রার্থী কাছাকাছি নম্বর পেলেও খন্দকার উম্মে সালমা মৌখিকে ১০ এর মধ্যে ৭ নম্বর পান। অন্যদিকে দ্বিতীয় হওয়া প্রার্থী মোহাম্মদ ফারুক আহাম্মদকে দেওয়া হয় মাত্র ৪ নম্বর।

নিয়োগ প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলা পর্যায়ের নিয়োগ পরীক্ষায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু খন্দকার উম্মে সালমার স্বামী যেহেতু ওই উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, তাই উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার মো. আরিফুল আজমকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার প্রতিনিধি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অধীনে চাকরি করেন। তাই স্বাভাবিকভাবে তিনি খন্দকার উম্মে সালমারই পক্ষে থাকবেন। যে কারণে খন্দকার উম্মে সালমার বিএড ডিগ্রি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হলেও তাকেই নির্বাচিত করে নিয়োগ বোর্ড। অথচ দারুল ইহসানের সনদে এমপিওভুক্তি বন্ধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার প্রভাব কাজ করেছে। আর এমপিওভুক্তির জন্য সনদ যাচাইয়ের দায়িত্বও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার। অথচ বর্তমানে দারুল ইহসানের সনদ অবৈধ হওয়ার পরও তিনি তা যাচাই-বাছাই করে বৈধ হিসেবে এমপিওভুক্তির সুপারিশ করেন। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে তার স্ত্রী এমপিওভুক্ত হয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।

২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল আদালত এক রায়ে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করে। এ নামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি না দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশও দেওয়া হয়। রায়ে বলা হয়, দারুল ইহসান কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয়। রায় প্রকাশের পর দারুল ইহসান থেকে পাস করা বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তিতে জটিলতা তৈরি হয়। পাশাপাশি ওই প্রতিষ্ঠানের সনদে নতুন এমপিওভুক্তির পথ বন্ধ হয়ে যায়। জটিলতা নিরসনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর রায়ের আগে অর্জিত সনদধারীদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতামত চায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ২৮ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মোতাবেক দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত সনদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। ওই সনদের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে বিধি মোতাবেক নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক, কর্মচারীদের এমপিওভুক্তসংক্রান্ত সব কার্যক্রম মাউশি অধিদপ্তর গ্রহণ করবে। এরপর ২৯ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে ২৮ আগস্টের বিজ্ঞপ্তিটি স্থগিত করা হয়। অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, দারুল ইহসানের সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খন্দকার উম্মে সালমা ২০২২ সালের নভেম্বরে এমপিওভুক্তির আবেদন করেন। যদিও তিনি আগে থেকেই এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষক ছিলেন। সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে তার বিএড ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৯ আগস্টের পর দারুল ইহসানের কোনো ধরনের সনদে এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই। অথচ উম্মে সালমার স্বামী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ সনদের বৈধতা দিয়ে এমপিওভুক্তির জন্য পাঠিয়েছেন। যার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ ভঙ্গ করেছেন।

দারুল ইহসানের বিএড সনদ দিয়ে এমপিওভুক্তির সুযোগ আছে কি না, প্রশ্ন করা হলে খন্দকার উম্মে সালমার স্বামী বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৮ সালের ২৯ আগস্টের আদেশের পর দারুল ইহসানের সনদ দিয়ে এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই।’ তাহলে তার স্ত্রী খন্দকার উম্মে সালমা ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের পর কীভাবে এমপিওভুক্ত হলেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল মান্নান বলেন, ‘তার (খন্দকার উম্মে সালমা) যেহেতু এমএড করা রয়েছে, আর আগে থেকে তিনি অন্য স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত ছিলেন, তাই তাকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে।’

খন্দকার উম্মে সালমার এমপিওভুক্তির সময়ে কুমিল্লার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও কুমিল্লা অঞ্চলের উপপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন ইউনুছ ফারুকী। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া দেননি।