দেশে গত ১০ বছরের মধ্যে মাত্র ১ বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালের নভেম্বরে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ চূড়া দেখা গেছে। সে বছর সর্বোচ্চ রোগী ছিল এক দিন ৫৪৬ জন। পরে আস্তে আস্তে ডেঙ্গু কমতে থাকে।
অক্টোবরে চূড়া দেখা গেছে দুবছর ২০১৭ সাল ও ২০২২ সালে। এই দুবছর চূড়ার দিন রোগী ছিল যথাক্রমে ৫১২ জন ও ২১ হাজার ৯৩২ জন।
সেপ্টেম্বরে চূড়া ছিল পাঁচ বছর। এর মধ্যে ২০১৩ সালে সে মাসের চূড়ার দিন রোগী ছিল ৪৯৫ জন, ২০১৫ সালে ৯৬৫ জন, ২০১৬ সালে ১ হাজার ৫৪৪ জন, ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮৭ জন ও ২০২১ সালে ৭ হাজার ৮৪১ জন।
এ ছাড়া আগস্টে চূড়া ছিল ২০১৯ সালে ও জুলাইয়ে ২০১৪ সালে। এই দুবছর সে মাসের এক দিন সর্বোচ্চ রোগী ছিল যথাক্রমে ৫২ হাজার ৬৩৬ জন ও ৮২ জন।
এই ১০ বছরের ডেঙ্গু রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চূড়ায় ওঠার পরের মাসগুলোতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ছিল না বললেই চলে। এমনকি চূড়ায় ওঠা রোগীর সংখ্যাও ছিল খুবই কম। কিন্তু এ বছর এখনো চূড়া নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের হিসেবে, যেভাবে রোগীর সংখ্যা ওঠা-নামা করছে এখনো চূড়া নিশ্চিত করা যায়নি। তবে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রোগী ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর ৩ হাজার ১২৩ জন। এরপর রোগীর সংখ্যা এখনো গড়ে দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজারের ঘরে রয়েছে।
এমনকি গত রবিবার এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তিন লাখ ও মৃত্যু দেড় হাজার ছাড়িয়েছে। রোগী ও মৃত্যুর এই সংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ। বিশেষ করে মোট মৃত্যু ও রোগী অনুপাতে মৃত্যুহার বিশ্বের ডেঙ্গু আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এমন অবস্থায় এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে মনে করছেন রোগতত্ত্ববিদ ও কীটতত্ত্ববিদরা। তাদের মতে, আগামী ১৫ দিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে। এরপর শীত পড়লে ও তাপমাত্রা কমলে কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা ১২০০-১৫০০ এর মধ্যেই থাকবে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাপমাত্রা যদি ১৫ ডিগ্রির নিচে না আসে, তা হলে রোগী ওভাবে কমবে না। আমরা যেটা আশা করেছিলাম নভেম্বরের দিকে দৈনিক ২০০-৩০০ রোগী হবে, সেটা হবে না। রোগী এখনকার মতো ১২০০-১৫০০ এর মধ্যেই থাকবে।’
দেশে ডেঙ্গু এখন বছর জুড়েই থাকবে বলে মনে করেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গু দীর্ঘায়িত তো হচ্ছেই। কারণ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে যে বৃষ্টিপাত হলো, সেটার প্রভাব তো অন্তত ১৫ দিন থাকবেই। নতুন করে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমেছে। বৃষ্টি চলে গেলেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমে যাবে হয়তো, কিন্তু ডেঙ্গু দূর হবে না। কারণ এখনো পরিষ্কার পানি জমে থাকার যথেষ্ট উৎস আছে। ডেঙ্গু বাড়ার যতগুলো কারণ, যেমন-নোংরা পরিবেশ, পলিথিনের ব্যবহার, প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া, বিভিন্ন কন্টেইনার, রাস্তাঘাটে খানাখন্দে পানি জমে থাকা, বাড়ির আশপাশে পরিষ্কার না থাকা, সবগুলোই বিদ্যমান। এখন গ্রামাঞ্চলেও তো পৌর এলাকার মতো পরিবেশ হয়েছে। ফলে রোগী থাকবে, সংখ্যা কমে আসবে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এ বছরের ডিসেম্বরে একটু কমবে ও আগামী বছরের জানুয়ারিতে কম থাকলেও আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আবার বাড়া শুরু করবে। নিয়মিত একটি রোগ হয়ে গেল।
একইভাবে ডেঙ্গু এখন বছর জুড়েই থাকবে বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, আগামী দুই-আড়াই মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে এলেও ৪০০-৫০০ রোগী প্রতিদিনই থাকবে। শীত পড়লে ওই সময় রোগী কমে ২০০-৪০০ তে নেমে আসবে। কিন্তু সারা বছরেই রোগী থাকবে। ১০০’র নিচে রোগী নেমে আসার সম্ভাবনা নেই। মৃত্যু থাকবে। কারণ ডেঙ্গুর ধরনও বদলে গেছে।
এমন অবস্থাকে দেশের মানুষের জন্য ‘অশনিসংকেত’ বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, নানাদিক থেকেই ডেঙ্গু এবার যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে সামনের দিনগুলোর জন্য অশনিসংকেতের মতো আনছে। এটা সাধারণ মানুষের জন্য মোটেই কাম্য নয়।’
৩ লাখ ছাড়াল : গত রবিবার দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। গতকাল পর্যন্ত মোট রোগী দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২ হাজার ৪৫২ জনে। এই সংখ্যা এ বছর তো বটেই, ডেঙ্গুর গত ২৩ বছরের ইতিহাসেও সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বোচ্চ রোগী ছিল ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। এ বছরের গত ২১ আগস্ট সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। এরপর উদ্বেগজনক হারে রোগী বাড়িতে থাকে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নতুন করে আরও ১ হাজার ১৯৭ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে এ মাসের গত ২০ দিনেই ভর্তি হয়েছে ৩১ হাজার ২৭৭ জন। অর্থাৎ নভেম্বরের শেষের দিকে এসেও প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি বা ১ হাজার ৫৬৪ জন করে আক্রান্ত হচ্ছে।
গত মাসেও দৈনিক ২ হাজার ১৮৬ জন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার আগের মাস সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড় ভর্তি রোগী ছিল ২ হাজার ৬৫৩ জন ও আগস্টে ২ হাজার ৩২২ জন।
এবারই গ্রামে বেশি রোগী : সর্বশেষ ২০১৮ সালেও মোট ডেঙ্গু রোগীর শতভাগই ছিল ঢাকায়। কিন্তু এরপর থেকে ঢাকার বাইরে গ্রামাঞ্চলে রোগী বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে মোট রোগীর ৪৯ শতাংশ, ২০২০ সালে ১৩ শতাংশ, ২০২১ সালে ১৭ শতাংশ ও ২০২২ সালে ৩৭ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরের। কিন্তু এ বছর গ্রামাঞ্চলে রোগীর সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এবারই প্রথম দেশের সব জেলায় ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত রবিবার পর্যন্ত এ বছর মোট রোগীর ৬৫ শতাংশই ছিল ঢাকার বাইরে। সেদিন পর্যন্ত ঢাকার বাইরে মোট রোগী ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার ৭২০ জন ও বাকি ৩৫ শতাংশ বা ১ লাখ ৫ হাজার ৫৩৫ জন ঢাকায়।
২২ জেলায় বেশি রোগী : এ বছর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ লাখের বেশি ও সর্বনিম্ন ৩ হাজারের মতো রোগী পাওয়া গেছে ২২ জেলায়। এর মধ্যে গত রবিবার পর্যন্ত সর্বোচ্চ রোগী ছিল ঢাকায় জেলায়, মোট রোগীর ৩৬ শতাংশ বা ১ লাখ ৮ হাজার ৪৮৮ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গেছে চট্টগ্রামে ১৩ হাজার ৪৭৬ জন, তৃতীয় সর্বোচ্চ বরিশালে ১২ হাজার ৯০৩ জন ও চতুর্থ সর্বোচ্চ মানিকগঞ্জে ১২ হাজার ২৫৬ জন। এরপর পটুয়াখালী ৭ হাজার ৩৩০ জন, পিরোজপুরে ৬ হাজার ৯০২ জন, লক্ষ্মীপুরে ৬ হাজার ৬৪৮ জন, গাজীপুরে ৬ হাজার ৩৭০ জন, খুলনায় ৬ হাজার ২৬ জন, রাজশাহীতে ৫ হাজার ৩৪১ জন, চাঁদপুরে ৫ হাজার ২৬০ জন, মাদারীপুরে ৫ হাজার ১২৬ জন, মাগুরায় ৪ হাজার ৬৭৯ জন, যশোরে ৪ হাজার ৪২২ জন, ময়মনসিংহে ৪ হাজার ২০০ জন, নরসিংদীতে ৪ হাজার ১৯৬ জন, কক্সবাজারে ৪ হাজার ১৮৭ জন, কুষ্টিয়ায় ৩ হাজার ৯৩৯ জন, রাজবাড়ীতে ৩ হাজার ৮২৩ জন, ভোলায় ৩ হাজার ৭৫৬ জন, ঝিনাইদহে ৩ হাজার ৬৮৭ জন ও পাবনায় ৩ হাজার ১৩৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
অশনিসংকেতের চার দিক : অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, সংখ্যা কোনো একটা রোগের বিশেষ অবস্থা নির্দেশ করে, কিন্তু সেটাই সব না। এখন দেখা যাচ্ছে সারা বছর ধরেই হচ্ছে। এটা নতুন বৈশিষ্ট্য। ডেঙ্গু যে এখন কেবল দুই-তিন মাস বেশি করে হবে, তেমন না। এখন দেখা যাচ্ছে যে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ডেঙ্গু এখন গ্রামেও ছড়িয়ে গেল, এটা এখন আর শুধু ঢাকা শহরের রোগ নয়। এটা সারা বাংলাদেশের রোগ। বিশেষ করে যখন গ্রামাঞ্চলে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন সেখানে সেই রোগ মোকাবিলা করার মতো সামর্থ্যরে ঘাটতি থাকে। কারণ সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সে পর্যায়ে না, যে তারা ঢাকায় বা বড় শহরে রেখে রোগীর চিকিৎসা করাবেন। সে ক্ষেত্রে যখন গরিব লোকরা কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়, অতীত অভিজ্ঞা বলে, তখন মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।
ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু বাড়লে ডেঙ্গুতে যে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য খরচ, সেটা বেড়ে যায়। অর্থাৎ অনেক মানুষ চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে। এতে প্রান্তিক লোকজন আরও বেশি করে চরম দারিদ্র্যসীমায় চলে যাবে। এটা অতীতে ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটাবে। এটাও একটা চিন্তা।
অশনিসংকেতের সর্বশেষ কারণ হিসেবে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ঢাকা বা বড় শহরগুলোর মতো চিকিৎসার জন্য রোগ শনাক্ত থেকে শুরু করে ভালো মানের চিকিৎসা ব্যবস্থা, চিকিৎসক গ্রামে নেই। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে খরচ করা সত্ত্বেও মৃত্যু প্রতিহত করা যাবে, সেটা বলা যায় না।