প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জনগণের জন্য যদি কাজ করতে হয় তাহলে জনগণকে হত্যা করে লাশের ওপরে পাড়া দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার যারা চিন্তা করে তাদের মতো অমানবিকতা আমি আর কোথাও দেখি না। এটা আমাদের কাছে ভাবতেও অবাক লাগে। কাজেই আমরা শান্তি চাই।’ গতকাল বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস-২০২৩’ উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ যখন একটু শান্তিতে ছিল, স্বস্তিতে ছিল, একটু আশার আলো দেখছিল এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সে সময়ে এই অগ্নিসন্ত্রাস, হরতাল, অবরোধ মানুষের জীবনটাকে আবার ব্যাহত করছে। একটা শঙ্কার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এটাই হচ্ছে সব থেকে কষ্টের বিষয়। যারা এই ধ্বংসাত্মক কাজ করছে তাদের বোধোদয় হবে, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ না করে গণতান্ত্রিক ধারায় যোগ দিক, জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখুক। খবর বাসসের।
তার সরকার একটার পর একটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কভিড-১৯ আমরা যেভাবে মোকাবিলা করলাম, এরপর অগ্নিসন্ত্রাস থেকে শুরু করে নানা ধরনের ঝামেলা মাঝে মাঝে শুরু হয়ঠান্ডা সাধারণ মানুষকে কেন পুড়িয়ে মারা হয় সেটাই আমার প্রশ্ন? এই সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারা, বাসে আগুন দেওয়া, রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করা এটা কী কারণে? আমার কাছে এটা এখনো বোধগম্য নয়।’
বাংলাদেশকে শান্তির অন্বেষক উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শান্তি শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয় আঞ্চলিক এবং বিশ্বব্যাপী আমরা শান্তি চাই।’
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়,’ এর উল্লেখ করে বলেন, ‘অন্তত আমি এটুকু দাবি করতে পারি, এ পর্যন্ত আমরা আমাদের এই পররাষ্ট্র নীতি নিয়েই চলেছি। সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে, আঞ্চলিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে আমাদের সমুদ্রসীমা, আমাদের স্থলসীমা, পার্বত্য শান্তিচুক্তি করে, আমাদের রিফিউজিদের ফিরিয়ে আনার মতো ব্যবস্থা আমরা করেছি। সুচারুভাবে আমরা এগুলো করতে পেরেছি। এমনকি ছিটমহলগুলো আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিনিময় করতে পেরেছি। কাজেই বাংলাদেশ শান্তির দেশ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে সরকার এসেই আওয়ামী লীগ সরকার সশস্ত্র বাহিনীতে নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও আমাদের দেশের নারী সদস্যরা অনেক সুনাম করেছেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং তিনি শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের আরও নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাশা করেছেন।
তার সরকারের উন্নয়ন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, শুধু ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল বা কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশের উন্নয়ন করা হচ্ছে। যাতে গ্রামে বসে প্রত্যেকটি গ্রামের মানুষ শহরের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেঠান্ডা বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান করা হচ্ছে, ফলে সারা বিশ্বে আজকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশংসিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এজন্য গর্বে আমার বুকটা ভরে ওঠে।’ তিনি বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের যাত্রা শুরু হবে ২০২৬ সালে। ২০২৬ সালের এই যাত্রা যেন ভালোভাবে করতে পারি, সেজন্য ইতিমধ্যে আমরা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছি। বাংলাদেশের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা যেন কেউ বন্ধ করতে না পারে, সেটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘শান্তিতে সমরে সব জায়গায় আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সদা সচেষ্ট এবং শক্তিশালী। সেই শক্তিশালী হিসেবেই একে আমরা গড়ে তুলছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০৪১ সাল নাগাদ স্মার্ট বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব। আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে উঠবে। অর্থাৎ স্মার্ট পপুলেশন, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট সোসাইটি। ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা এভাবেই বাংলাদেশকে গড়ে তুলব এবং এগিয়ে নিয়ে যাব।’
অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে কিছুই অর্জন করা যায় না : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াত জোট সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে চেতনায় ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে কিছুই অর্জন করা যায় না। সেজন্য অগ্নিসন্ত্রাসের পথ পরিহার করে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করার এবং তাদের পাশে থাকা প্রয়োজন।’
প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে সশস্ত্র বাহিনী দিবস-২০২৩ উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি মাল্টি পারপাস কমপ্লেক্সে ‘মুক্তিযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত নির্বাচিত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা প্রদান’ অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ২০২২-২৩ সালে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ শান্তিকালীন পদকপ্রাপ্ত সদস্যদের পদকে ভূষিত করেন।
প্রধানমন্ত্রী শিখা অনির্বাণে পৌঁছালে সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আবদুল হান্নান এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাকে স্বাগত জানান।
পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে যান। সেখানে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।