তালেবানের ভয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া এবং ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া আফগানদের দুর্দশার যেন শেষ নেই। প্রতিবেশী দেশ থেকেও তাদের বের হয়ে যাওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এখন এই অসহায় আফগানরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করছেন। আর তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮৩০ ডলার বা প্রায় এক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পাকিস্তান। সরকারিভাবেই তাদের ওপর এই ফি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আফগানদের সঙ্গে এমন অমানবিক আচরণে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কূটনীতিকরা, একই সঙ্গে জাতিসংঘও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আজ বুধবার প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আফগানদের কাছ থেকে পাকিস্তানের এই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা।
গার্ডিয়ান জানায়, গত ১ নভেম্বর আশ্রিত আফগানদের দেশ ত্যাগের আল্টিমেটাম দেয় পাকিস্তান সরকার। চলতে থাকে ধরপাকড়, জোরপূর্বক আফগানদের ঠেলে দেওয়া হয় সীমান্তের দিকে। পাকিস্তান সরকারের তথ্যমতে দেশটিতে অবৈধভাবে ২০ লাখের বেশি আফগান নাগরিক ছিলেন। তাদেরকে বেঁধে দেওয়া সময়ের পর জোর করে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে শুরু করে পাকিস্তান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর দেশটির যে নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশীদের সঙ্গে কাজ করেছিল তারা প্রাণ বাঁচাতে পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। অথচ তাদের মধ্যে মাত্র ২৫ হাজার আশ্রয় দেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, আর যুক্তরাজ্য ২০ হাজার আফগানকে পুনর্বাসনে রাজি হয়েছে। বাকীদের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত। এদিকে যাদের পশ্চিমা দেশগুলো পুনর্বাসনে রাজি হয়েছে তারাও পাকিস্তান ছাড়তে গিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়েছেন। কারণ পাকিস্তান ত্যাগ করার ফি ধার্য করে দিয়েছে সেদেশের সরকার। শুধু তা-ই নয়, এই ফি আফগানদের দিতে হবে ক্রেডিট কার্ডে! অথচ বেশিরভাগ আফগান নাগরিকের পাকিস্তানে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, সহজভাবে বলতে গেলে ক্রেডিট কার্ডে ৮৩০ ডলার দেওয়া আফগানদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
পাকিস্তানের এধরণের নজীরবিহীন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও হতবাক করছে বলে দাবি গার্ডিয়ানের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক বলেন,’ আমরা জানি যে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে বেশ নাজুক পরিস্থিতি পার করছে। কিন্তু তাই বলে এই অসহায় শরণার্থীদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় মোটেও কাম্য নয়।’
আরেক কূটনীতিক বলেন, ‘পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় শুরুতে তাদের দেশ ছাড়ার সুযোগ দিতে প্রতিজন আফগানের কাছ থেকে ১০ হাজার ডলার নিতে চেয়েছিল। আমরা এব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করায় পরে তা কমিয়ে ৮৩০ ডলার করে পাকিস্তান সরকার।’
এদিকে এই ফি এবং তাও আবার ক্রেডিট কার্ডে তা পরিশোধের সিদ্ধান্তে অনড় পাকিস্তান সরকার। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মুমতাজ যাহরা বালোচ বলেছেন,’ এই বিপুল পরিমাণ আফগান প্রায় দুই বছরে ধরে পাকিস্তানে থেকেছেন, তারাতো শরণার্থী না, অভিবাসী। আমরা আশা করি যেসব দেশ এই আফগানদের অবস্থা নিয়ে শঙ্কিত তারা এগিয়ে আসবে, পাকিস্তান ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে চাওয়া আফগানরা যেন তাড়াতাড়ি এই দেশ ছাড়তে পারে সেজন্য সহায়তা করবে।’
এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর কর্মকর্তা বাবল বালোচ বলেন, ‘ছাড়ার এই বিপুল ফি পাকিস্তান ছাড়তে চাওয়া আফগানদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। অথচ মানবিকতার স্বার্থেই এই অসহায় আফগানদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করছে বিশ্বসম্প্রদায়।’