যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত: আবারও কি মধ্যস্থতায় সফল হবে পাকিস্তান?

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা সাময়িক আস্থাও ভেঙে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবারও ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পাকিস্তান কতটা সক্ষম হবে সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। 

পাকিস্তান এখনো সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট থামানোর মতো কার্যকর চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ইসলামাবাদের হাতে খুবই সীমিত।

গত ১৭ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেন। দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি এবং যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা হয়েছিল। সে সময় এটিকে ইসলামাবাদের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু চার সপ্তাহও পার হয়নি, এরই মধ্যে সেই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত কয়েক দিনে দুটি পৃথক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় ও কয়েকটি আরব দেশের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তেহরানের দাবি, এসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। 

তেহরানের সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যান্ড মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পারস্য উপসাগর গবেষণা বিভাগের পরিচালক জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কখনোই দুই দেশের মূল বিরোধের স্থায়ী সমাধানের উদ্দেশ্যে করা হয়নি। 

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'এই সমঝোতা স্মারকে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিরোধগুলোর সমাধান ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সংঘাত সাময়িকভাবে থামানো এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালি আবারও খুলে দেওয়া।' 

হেইরান-নিয়ার মতে, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখে। এটি শুধু প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার নয়, বরং একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক শক্তি। এই কৌশলগত সুবিধা ধরে রাখতে প্রয়োজন হলে ইরান যুদ্ধের ঝুঁকিও নিতে প্রস্তুত বলে মনে করেন তিনি।

তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর হাতে বিরোধ মেটানোর মতো কার্যকর কোনো উপায় নেই। তবে সীমিত সামরিক সংঘর্ষের ফলে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে, তখন পরিস্থিতি বদলাতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ নৌ অবরোধ আরোপ করে, সেটি কৌশলগত সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে, দোহার গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফার বলেছেন, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের অবস্থান আরও কঠোর হয়ে ওঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, 'পাকিস্তান এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দেশটি বরাবরের মতোই দুই পক্ষের ওপর নির্ভরশীল। তবে এখন ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।'

থাফারের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন উভয়ই উত্তেজনা বৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে, তখন পরিস্থিতি শান্ত করার মতো বাস্তব সক্ষমতা পাকিস্তানের হাতে খুবই কম।

তিনি আরও বলেন, 'যখন উভয় পক্ষ মনে করবে যে শক্তির ভারসাম্য কোনো এক পক্ষের অনুকূলে গেছে, তখন হয়তো তারা আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে রাজি হবে।' 

তবে সংঘাতের মধ্যেও মধ্যস্থতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পাকিস্তান, কাতার ও ওমানসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক মেনে না চললে ইরানও তার প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকবে।

এদিকে পাকিস্তানও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। রোববার দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ফোনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সংকট সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতিকেই একমাত্র কার্যকর পথ বলে উল্লেখ করেন।

এর আগে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সতর্ক করেন যে, অনেক কষ্টে অর্জিত শান্তি আবারও হুমকির মুখে পড়েছে। শনিবার ইসহাক দার সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গেও পৃথকভাবে আলোচনা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে। ফলে পাকিস্তান, কাতার বা অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারী আবারও দুই দেশকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের ৮ এপ্রিল স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির পর এটি অন্তত তৃতীয়বারের মতো সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ার ঘটনা।

প্রথম দফায় ইসলামাবাদে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। এরপর উভয় পক্ষই একে অপরের জাহাজে হামলা চালায়।

পরে ১৭ জুন নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান দাবি করে, অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা কয়েকটি জাহাজে তারা হামলা চালিয়েছে। এর জেরে আবারও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা বাড়ে।

বিশেষ করে গত সপ্তাহে ইরানের ট্যাংকারে হামলার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। 

ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির অন্তত ১০টি প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন সেনাসদস্য, দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের কয়েকজন জেলে এবং সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া মধ্য এশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য করিডোরের একটি রেলসেতু এবং সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের ব্যবহৃত মাশহাদের একটি সেতুতেও হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।

নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারও সরাসরি এর প্রভাবের মুখে পড়েছে। রোববার দেশটিতে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্তত তিনজন আহত হন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, ১৭ জুনের সমঝোতা স্বাক্ষরের মাত্র ২৫ দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এর প্রায় সব শর্ত লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে পরিবহন অবকাঠামো ও মাছ ধরার নৌযানে হামলার ঘটনাকে তারা ওই লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, 'ইরান শুরু থেকেই সদিচ্ছা নিয়ে সমঝোতা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই অপর পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমরাও নিজেদের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ থাকিনি এবং ভবিষ্যতেও একই নীতি অনুসরণ করব।' 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত