শত্রুও যাকে করত সমীহ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বাংলাদেশ ও বাঙালি স্বার্থবিরোধীদের চক্ষুশূল। সেই আন্দোলন-সংগ্রামের সময় থেকেই বঙ্গবন্ধুর অন্যতম শক্তি ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেতেন আলোচনা বৈঠকের বিপরীতে বসা মানুষরা। জুলফিকার আলী ভুট্টো এ কারণে বলেছিলেন, ‘আলোচনার বৈঠকে মুজিবকে আমি ভয় পাই না। ইমোশনালি কায়দায় হয়তো মুজিবকে কাবু করা যায়, কিন্তু তার পেছনে ফাইল বগলে চুপচাপ যে নটোরিয়াস লোকটি বসে থাকে তাকে কাবু করা ভীষণ শক্ত।’ জুলফিকার আলী ভুট্টো যার ভয়ে ভীত থাকতেন তিনি আর কেউ নন, তাজউদ্দীন আহমদ। আবার এই মানুষটিই নিজের দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভীষণ নরম। অফিসের পিয়ন অসুস্থ হয়ে পড়লে অন্যের সেবাযতেœর অপেক্ষায় না থেকে নির্দ্বিধায় তার সেবা করতেন। যখন জেলে ছিলেন তখন একটি বিজ্ঞাপনে একটি মেয়ের ছবি দেখে নিজের সন্তানের কথা মনে হয়েছিল বলে ছবিটি কেটে কাছে রেখেছিলেন। এই তাজউদ্দীনই আবার মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও একটি দিনের জন্যও পরিবারের সঙ্গে রাত্রিযাপন করেননি। দেশের জন্য মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যরা যখন পরিবার থেকে দূরে বিধ্বস্ত জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন তখন তিনি নিজের পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপনকে অনৈতিক ভেবেছেন। এমনই নরমে-কঠিনে মিশেল তার চরিত্র ও জীবন। যে জীবন হতে পারে যে কোনো দেশপ্রেমিকের আদর্শ। রাজনীতি সচেতন সুলেখক প্রত্যয় জসীম যথার্থভাবেই তুলে এনেছেন তাজউদ্দীন আহমদের জীবনী তার ‘তাজউদ্দীন আহমদ’ গ্রন্থে।

জীবনীগ্রন্থ পাঠের অন্যতম উপকারিতা হলো, কাহিনির নয়- বাস্তবজীবনের নায়কের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে, তাদের নায়কোচিত গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হয় পাঠকের চরিত্র। তাজউদ্দীনের বৈচিত্র্যময় জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার মাধ্যমে বইয়ের পরিসর অনুযায়ী একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে একজন তাজউদ্দীন কীভাবে হয়ে ওঠেন, যা নবীনদের জীবন গঠনে যথেষ্ট সহায়তা করবে।

তাজউদ্দীন আহমদের বাবা ছিলেন একজন মৌলভী। তিনি তাকে আরবি শিক্ষা দেন। প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন ভুলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে কাপাসিয়া মাইনর ইংরেজি স্কুল। আরবি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার জ্ঞানলাভ করেন তিনি ছেলেবেলাতেই। ছিলেন কোরআনের হাফেজ। কাপাসিয়া মাইনর স্কুলে পড়ার সময় পড়েছিলেন বিভিন্ন বই। ফলে ধর্ম বা বিশ্বরাজনীতি বিষয়ে তার সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে উঠেছিল। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার সময় ভারতবর্ষ ইংরেজ শাসনাধীন ছিল। নিজেকে তিনি মুক্তি সংগ্রামের জন্য গড়ে তুলেছিলেন সে সময়ই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি সিভিল ডিফেন্সের ট্রেনিং নিয়েছিলেন। স্কুলে পড়ার সময়েই তিনি জজ কোর্টে গিয়ে বাদী-বিবাদী দুপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনতেন। জজের রায় নিয়ে ভাবতেন, সহপাঠীদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, যখন তিনি এমএলএ নির্বাচিত হন তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিষয়ের স্নাতক ডিগ্রিধারী একজন ছাত্র। এমএ ডিগ্রি নিতে পারেননি প্রাদেশিক নির্বাচনের জন্য। পরে মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশ স্বাধীন করেছেন। স্বাধীন দেশেই দেশের মানুষের হাতে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর দিনে দিনে হয়েছেন বিস্মৃত। কথা প্রকাশ প্রকাশনীর জীবনী গ্রন্থমালা সিরিজের এই বই নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেছে বিস্মৃতপ্রায় এই জননায়ককে।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জীবন সম্পর্কে জানতে পড়তে পারো জীবনীগ্রন্থ ‘তাজউদ্দীন আহমদ’।