পিতা-মাতা মানুষের জান্নাত-জাহান্নাম

পৃথিবীতে মানুষের আগমনের স্বাভাবিক মাধ্যম হচ্ছেন পিতা-মাতা। তারা সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কষ্ট-ক্লেশের মধ্য দিয়ে তিলে তিলে সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ ও উত্তম ব্যবহারের ফলে জীবন চলার নানা অধ্যায় ও পর্যায়ে প্রভূত বরকত ও রহমত নেমে আসে। ইসলামও পিতা-মাতাকে দিয়ে প্রভূত সম্মান ও মর্যাদা। এর কয়েকটি হলো

কৃতজ্ঞতা আদায় : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে। ‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতা সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছিশ্ব (কেননা) তার মা কষ্টের পর কষ্ট সয়ে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুবছরেশ্ব তুমি কৃতজ্ঞতা আদায় কর আমার এবং তোমার পিতা-মাতার। আমারই কাছে (তোমাদের) ফিরে আসতে হবে।’ শ্বসুরা লুকমান : ১৪

আয়াতের বর্ণনায় এটা স্পষ্ট যে, মানুষ যেন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় করে। এখানে বিশেষভাবে মায়ের মেহনতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মা কতই না কষ্টের সঙ্গে তাকে নিজের গর্ভে ধারণ করে রাখে। তারপর একটানা দুবছর তাকে দুধ পান করায়।

উত্তম আচরণ : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো, পিতা-মাতার কোনো একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের উফ পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ শ্বসুরা বনী ইসরাইল : ২৩

সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টি : পিতা মাতার বৈধ অনুসরণ অনুকরণের মধ্য দিয়ে তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত। আর তাদের অবাধ্য ও বিরোধিতা করে অসন্তুষ্টি অর্জনে মহান আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মাতা-পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়। আর তাদের অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি রয়েছে।’ শ্বজামে তিরমিজি : ১৮৯৯

পিতা-মাতার হক : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, মানুষের মধ্যে আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সর্বাপেক্ষা হকদার কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা, সে আবার জিজ্ঞাসা করল, অতঃপর কে? রাসুল (সা.) বললেন, তোমার মা, এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, অতঃপর কে? রাসুল (সা.) বললেন তোমার মা তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, এরপর কে? রাসুলুল্লাহ(সা.) বললেন, তোমার পিতা।’ শ্বসহিহ মুসলিম : ৬৩৯৪

সদ্ব্যবহার সর্বোত্তম আমল : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে এক লোক এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন আমলটি উত্তম? তিনি বললেন, ‘যথাসময়ে নামাজ আদায় করা, অতঃপর কোন আমলটি উত্তম? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, আবার জিজ্ঞাসা করলেন, অতঃপর কোন আমলটি উত্তম? হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।’ শ্বসহিহ বোখারি : ৭৫৩৪

অবাধ্য হওয়া কবিরা গোনাহ : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘এক দিন সাহাবাদের লক্ষ্য করে বললেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গোনাহ সম্পর্কে অবগত করব না? এ কথাটি তিনি বারবার বললেন, (তখন সকল সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! অবশ্যই বলুন, তিনি বললেন) আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।’ শ্বসহিহ বোখারি : ২৬৫৪

দোয়া করা : পিতা-মাতার জন্য সন্তানের ওপর অনেকগুলো করণীয় আছে, এর মধ্যে একটি হচ্ছে, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তানের তাদের জন্য দোয়া করা। ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের মৃত্যুর পর তার সমস্ত আমলের (সওয়াব) বন্ধ হয়ে যায়, অবশ্য তিনটি আমলের (সওয়াব) বন্ধ হয় না। সাদকায়ে জারিয়া। উপকারী ইলমের সওয়াব। নেক সন্তান পিতা-মাতার জন্য যে দোয়া করে।’ শ্বসহিহ মুসলিম : ৪৩১০

সন্তানের জান্নাত-জাহান্নাম : সন্তান যদি পিতা মাতার খেদমত করে তাদের সন্তুষ্ট করতে পারে এর বিনিময়ে তার জান্নাত লাভ হয়। বিপরীতে যদি তাদের নানাভাবে কষ্ট দেয়, কিংবা তাদের অবাধ্য হয়, তাহলে এর ফলে জাহান্নামে যেতে হবে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবু উমামা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, এক লোক হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, সন্তানের ওপর পিতা-মাতার কি হক? হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, পিতা-মাতা হয়তো তোমার জন্য জান্নাত, কিংবা জাহান্নাম।’

সুনানে ইবনে মাজা : ৩৬৬২