বিএনপির যে সঙ্গীরা অনড়

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষনেতাদের সরকার ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তরফ থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে আলোচনা রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দীর্ঘদিন রাজপথে অনুপস্থিত ছিলেন। আড়াল ভেঙে অবশেষে তিনি ফিরেছেন রাজপথে। গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গণতন্ত্র মঞ্চের কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ, কিন্তু এর মধ্যে মাহমুদুর রহমান মান্না কোথায় এমন প্রশ্ন ওঠায় আমি এখানে এসেছি।’

নির্বাচনে অংশ নিতে চাপের বিষয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে নির্বাচনে নিয়ে যেতে সরকার থেকে আমাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। আমাকে এমপি করার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। আমি নির্বাচনে যাব না, মান্না দালাল নয়। আমরা যে আন্দোলন করছি, এক দফার আন্দোলন। এ থেকে পিছপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

মান্না একাই নন, একই ধরনের অভিযোগ গণ অধিকার পরিষদের একাংশের সভাপতি নুরুল হক নুরের। নির্বাচনে যেতে কোনো চাপ আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে নির্বাচনে নিয়ে যেতে, মামলার হুমকি দিচ্ছে, টাকার প্রলোভন দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি এবং আমার দল নির্বাচনে যাবে না। রাজনীতিতে চাপ থাকবে, প্রলোভন থাকবে। এগুলো উপেক্ষা করে অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে যাবে না, তাই সরকার চেষ্টা করছে ছোট দলগুলোকে নির্বাচনে নিয়ে সংখ্যা বাড়াতে। তাদের অপচেষ্টায় কিছু রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যে নতিস্বীকার করেছে। সরকার রাজনীতির মাঠে কোরবানির হাট বসিয়েছে। এই কোরবানির হাটে রাজনীতিবিদরা গরু-ছাগলের মতো বিক্রি হচ্ছেন।’

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ছাড়াই আগামী নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত কোনো সমঝোতা চেষ্টা দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার প্রশ্নে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিভক্ত। আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় আওয়ামী লীগ চাচ্ছে যত বেশিসংখ্যক দলকে নির্বাচনে নিয়ে যাওয়ার। এ ক্ষেত্রে ছোট দলগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছোট ছোট বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে নেওয়ার চেষ্টা চলবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত। নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের নির্বাচনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে, প্রলোভন দেখানো হবে। আর এই চেষ্টা ও চাপ উপেক্ষা করে নির্বাচন থেকে দূরে থাকা কঠিন হবে। ইতিমধ্যে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ছোট কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত ১১টি ইসলামি দলের মধ্যে ৭টি নির্বাচনে যাওয়ার এবং ৪টি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া ইসলামি দলগুলো হলো বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, জাকের পার্টি ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। এর মধ্যে শুধু তরিকত ফেডারেশনের গত দুটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব ছিল। অন্যদিকে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে এখনো অনড় আছে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী বাংলাদেশ নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিলেও এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির সহসভাপতি শাহিনুর পাশা চৌধুরী। তিনি চারদলীয় জোট সরকারের সময় সংসদ সদস্য ছিলেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনের। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় আরও ৯টি ইসলামী দলের ১৩ জন নেতা সেখানে ছিলেন। এরপর তার সদস্যপদ স্থগিত করেছে জমিয়ত।

এ প্রসঙ্গে জমিয়তে ইসলামী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, শাহিনুর পাশা দলীয় সিদ্ধান্ত ও অবস্থানের বিপক্ষে আসতে প্ররোচিত করাসহ এমন কিছু কর্মকাণ্ড করেছেন, যা দলের শৃঙ্খলা পরিপন্থী। তার এসব আচরণে দলের নীতি-আদর্শ ও ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে। তার প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব পর্যায়ের পদ স্থগিত করেছে দলটি।

সরকার চাপ প্রয়োগ বা প্রলোভন দেখিয়ে নির্বাচনে নিয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে শাহিনুর পাশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়া নাগরিক অধিকার। দীর্ঘদিন সরকারের বাইরে থেকে আন্দোলন করেও কিন্তু কোনো সমাধান আসছে না। আমি প্রথমে দলে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে আলাপ করেছিলাম, কিন্তু রাজি হয়নি। আমাকে কোনো প্রলোভন দেখানো হয়নি, এমনকি এমপি হওয়ার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়নি। দিলে তো আওয়ামী লীগ আমার আসনে আজ প্রার্থী দিত না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি, সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্য।’

শাহিনুর পাশার সঙ্গে গণভবনে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের আমির আতাউল্লাহ হাফেজ্জী। পাঁচটি ইসলামি দল নিয়ে ‘সমমনা ইসলামি দল’ নামে একটা জোট গঠন করেছেন তারা। এই জোট নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আতাউল্লাহ হাফেজ্জীর বাবা প্রয়াত মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী (হাফেজ্জী হুজুর) রাজনীতিতে সবসময় আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

খেলাফত আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক মাওলানা সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কত আসনে নির্বাচন করব কিংবা আর কোনো বড় জোটে যাব কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি দিতে দেখা যায় ইসলামী আন্দোলনকে। নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দাবিতে ইসলামী আন্দোলন নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি দিয়েছিল। একটা সময়ে ধর্মভিত্তিক এই দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরকারের ভালো সম্পর্ক ছিল। সর্বশেষ বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ একাধিক সিটি নির্বাচন ও উপনির্বাচনেও তারা অংশ নেয়। নির্বাচনগুলোতে তুলনামূলভাবে তারা ভালো ফলাফল করেছিল। কিন্তু বরিশাল সিটি নির্বাচনে তাদের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের (চরমোনাই পীর) ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে। বরিশালের ঘটনার পর থেকে তারা এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেয়। তারা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে নানা কর্মসূচি দিলেও রাজনীতির মাঠে গুঞ্জন আছে শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে যাওয়ার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের মিডিয়া সেলের সমন্বয়ক শহিদুল ইসলাম কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের আমির ঘোষণা দিয়েছেন এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার। এর কোনো ব্যত্যয় হবে না। নির্বাচনে নিয়ে যেতে ইতিমধ্যে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে, অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন কিন্তু আমরা নির্বাচনে যাব না। আমাদের টাকা কিংবা সংসদে আসনের লোভ দেখিয়ে যারা নির্বাচনে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তারা ভুল করছেন। ইসলামী আন্দোলন দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।’

সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পর রাজনীতির মাঠ যেভাবে সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে তাতে অনেকেই আন্দোলনের মনোবল হারিয়ে ফেলছেন। সরকার যেভাবে শক্ত হাতে আন্দোলন দমন করছে এবং বিএনপিকে মাঠছাড়া করেছে তাতে আন্দোলনের সফলতা নিয়ে শঙ্কিত। ২০১৪ ও ’১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও সরকার টিকে আছে। এ অবস্থায় সংসদে গিয়ে কিছু আসন পাওয়ার সুযোগ অনেকেই হাতছাড়া করতে চান না।

সর্বশেষ কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ‘যুক্ত ফ্রন্ট’ নাম দিয়ে তিন দলের একটি জোট গঠন করে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে নিয়মিত মুখ ছিলেন। হঠাৎ করে আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে তার নির্বাচনী ট্রেনে ওঠা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, পড়ন্ত বয়সে সংসদে আসন পাওয়ার মোহ সামলাতে না পেরে নির্বাচনী ট্রেনে উঠেছেন তিনি। যদিও ইবরাহিমের দাবি, কোনো প্রলোভন নয়, আন্দোলনে টিকতে না পেরে নির্বাচনে গিয়েছেন তিনি।

সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিকে। তিনি বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করছে তারা শেষ পর্যন্ত মাঠ ছেড়ে যাবে না। কল্যাণ পার্টির আন্দোলনে খুব বড় ভূমিকা ছিল না। সরকার চাইছে স্বৈরাচারের মতো আন্দোলন থেকে লোক বা দল বাগিয়ে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখাতে। আন্দোলনে ফাটল ধরানোর চক্রান্তও করছে। কিন্তু সরকারের এ ইচ্ছে পূরণ হবে না। যারা আন্দোলনে নেমেছে তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।’