একা আ.লীগের অনেক জট

আন্দোলন সামাল দিতে গিয়ে অনেক জট সামাল দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। কিন্তু মাঠের বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচনে না আসা নিয়ে যে জট সেটা না খুলেই নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ দিয়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্বের জট তো আছেই। এ অবস্থায় জোটসঙ্গী ও যাদের নির্বাচনে আনা হয়েছে, সেসব দলের আসনের ‘হিস্যা’ মিটিয়ে দেওয়ার সমস্যা সামনে এসে গেছে। সংসদের বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির জন্য আসন ছাড়ার প্রশ্নেও জটিলতা রয়েছে। আবার দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনের অনুমতি দেওয়ায় আরেকটি সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। সেজন্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯৮ আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সঙ্গে সঙ্গেই বড় জট সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগের আদর্শিক জোট ১৪ দলকে নিয়ে। নবম, দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে নির্বাচন করা শরিক দলগুলোকে আসন ছেড়ে দেওয়াসহ নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে আসন সমঝোতা করে গত তিনটি সংসদ নির্বাচন করে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ।

১৪ দলের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি : গত রবিবার আওয়ামী লীগ যে দুটি আসন বাদ রেখে প্রার্থী তালিকা দিয়েছে, সেখানে ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাসদের একটি ও বিরোধী দল জাপার একটি আসন রয়েছে। ১৪ দলীয় জোটের অন্য আসন ও জাপার আসনগুলোতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীনরা। এ নিয়ে নিজেদের জোটে যেমন বড় জট সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি সঙ্গে থাকা জাপার সঙ্গেও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেছে।

১৪ দলীয় জোটের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা তাদের বেশ মর্মাহত করেছে। আওয়ামী লীগের এ আচরণে মনে হচ্ছে জোট নেই। তাছাড়া দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে জোটে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেছে।

ওবায়দুল কাদের গত শনিবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, প্রয়োজন না পড়লে জোট করবে না আওয়ামী লীগ। ১৪ দলীয় জোটের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

১৪ দলের নেতারা বলেন, আওয়ামী লীগের হঠাৎ আচরণ কীসের ইঙ্গিত তা বুঝে উঠতে পারছেন না তারা।

জোটের নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিগত নির্বাচনগুলোর চেয়ে একটু আলাদা পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নির্বাচনে বিশেষ ‘ডিজাইন’ নির্ধারণ করেছেন। এ ‘ডিজাইনের’ কারণে অনেক হিসাব এবার মেলানো যাবে না। এ দুই নেতা আরও বলেন, জোটকেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনে জিতে আসতে হবে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কারও জেতার সুযোগ নেই। ফলে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তারা বলেন, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে ভুল বোঝাবুঝির নিরসন ঘটবে বলে তারা আশা করেন।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকায় যত বেশি দলীয় এমপি রাখা যায়, এবার সে পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামী লীগে। কারণ ঢাকায় আন্দোলন-সংগ্রাম মোকাবিলায় দলীয় এমপি না থাকলে অনেক সংকটে পড়তে হয়, যা এবার অনুভব করেছেন তারা। জোটের শরিক রাশেদ খান মেনন ঢাকা দক্ষিণের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ আসনে এমপি। আন্দোলন-সংগ্রামের কথা বিবেচনায় নিয়ে আসনটি আওয়ামী লীগের ঘরেই রেখে দিতে চায়। ঢাকার অন্য আসনগুলো নিয়েও একই পরিকল্পনা রয়েছে ক্ষমতাসীনদের।

১৪ দলীয় জোটের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় নির্বাচিত হয়েছি, আলাপ-আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে অন্য জায়গায় নির্বাচন করা কতটুকু মানানসই হবে সেটা সবাইকেই গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, এমন কিছু ঘটনায় ভুল বোঝাবুঝি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

জাপার জন্য জট : জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে বড় জট তৈরি করেছে। তাদের এখন নতুন করে অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিও তিনশর কাছাকাছি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এখন জট আওয়ামী লীগকেই খুলতে হবে।

জাতীয় পার্টির এ নেতাও মনে করেন, আওয়ামী লীগ প্রায় সব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করায় ১৪ দলীয় জোটের জন্যও কিছুটা নড়বড়ে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সবার মধ্যে সন্দেহ-সংশয় দেখা দিয়েছে।

বর্তমান সংসদে জাপার আসন সংখ্যা ২৩। এ ছাড়া চার সংরক্ষিত নারী আসনও রয়েছে দলটির। বিএনপি নির্বাচনে না এলে দলটি আরও আসন বাড়িয়ে বিএনপির জায়গা নেওয়ার দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যেতে চায়। জাপা সূত্রে জানা গেছে, এবার তারা ৪০-৫০টি আসনে ছাড় চায়। ফলে আসন নিয়ে আওয়ামী লীগকে জাপার সঙ্গে একটা রফায় আসতে হবে। সে ক্ষেত্রে অন্যদেরও আসন ছাড়ের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে ক্ষমতাসীনদের।

অন্য দলের দাবি পূরণ : অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ বেশ কিছু ছোট দলকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। নির্বাচনমুখী করতে নানা লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে নিবন্ধিত অনেক দলকে। ছোট দল ও নির্বাচন ঘিরে সামনে আসা কয়েকটি দলও আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণায় কিছুটা সংশয়ের মধ্যে রয়েছে। যারা শেষ বয়সে এসে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তাদের দাবি পূরণ করার চ্যালেঞ্জ আছে আওয়ামী লীগের। এ ছাড়া ‘কিংস’ পার্টি হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার দলগুলোর দাবিও মেটাতে হবে।

উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, জাপা ও ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলসহ নিবন্ধিত ২৬টি দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, ৩০টি দল নির্বাচনে আসবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ২৯৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ সময়ে অনেক কিছুর ফয়সালা সামনে অপেক্ষা করছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে, ভোট পর্যন্ত অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে, সেসব সামাল দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে ক্ষমতাসীন দলকেই। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হবে, করতে হবে অংশগ্রহণমূলকও। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক কতটা করতে পারবে সেটা একাই আওয়ামী লীগকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে। আন্দোলনে থাকা বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করার ব্যাপারেও চ্যালেঞ্জ আছে। এজন্য কোনো না কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে আওয়ামী লীগকে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারে রয়েছে। তাই এখনো কিছু দায়িত্ব আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নেওয়া হোক সে প্রত্যাশা দেশি-বিদেশি মহলের রয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, “এবারের নির্বাচন আওয়ামী লীগের ‘ডু অর ডাই’। ফলে সব জট খুলে বিজয়ী হওয়া খুব কঠিন। আন্দোলনে থাকা বিরোধী পক্ষের অরাজনৈতিক আচরণ জট খোলার চেষ্টায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। এখন জট খোলার চেষ্টার চেয়ে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দেওয়া ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হওয়াই অন্যতম লক্ষ্য।”

আওয়ামী লীগের আরেক সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দেশে একটি মহলের ভেতরে বদ্ধমূল ধারণা বিএনপি নির্বাচনে না আসাই মহাজট। আওয়ামী লীগ সেটা মনে করে না। আমাদের পক্ষ থেকে বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করতে। এ অবস্থায় আর কোনো সুযোগ রয়েছে তা মনে করে না আওয়ামী লীগ।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের মানুষ নির্বাচনী উৎসবে মাতোয়ারা। এ অবস্থায় কারও কোনো চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকানোর ক্ষমতা নেই।’