২০২৩ সালে যখন বিশ্বের নানাপ্রান্তে তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে তখন জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজ বৃহস্পতিবার শুরু হলো এবছরের জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৮। পেট্রোল বিক্রি করা ডলারে গড়ে ওঠা চকচকে আকাশচুম্বী অট্টালিকার দুবাইতে হাজির হয়েছে প্রায় ২০০ দেশের রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা, এনজিও কর্মী, গবেষক, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, বিক্ষোভকারী, ব্যবসায়ীরা। কিন্তু প্রতিবছর আয়োজিত জলবায়ু সম্মেলন থেকে আদৌ কী পেয়েছে বিশ্ব?
১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে বিশাল এই যজ্ঞের শুরু। সেইবার গঠন করা হয়েছিল জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক কনভেনশন। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতি বছরই কপ সম্মেলন হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সম্ভবত দীর্ঘ সময় ধরে চলা আন্তরাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন। কিন্তু এরপরও দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর এবং বিশ্বের জন্য আসলেই হিতকর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না।
গত বছর কপ-২৭ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়া উন্নয়নশীল দেশগুলো ধনী দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ তহবিলের জোর দাবি জানালেও সাড়া দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র, চীনের মতো শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারীরা। অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের বরফ গলছে, ঝড়-বন্যা বাড়ছে অন্যদিকে তাপপ্রবাহ পুড়ছে গোটা বিশ্ব।
দুবাইতে কপ-২৮ এ জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়েই মূল আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার ব্যাপারে গোটা বিশ্ব এই সম্মেলনে একমত হবে কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন।
সম্মেলন শুরুর কয়েক দিন আগে পশ্চিমা দেশগুলোর জ্বালানিবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, জ্বীবাশ্ম জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট আরও ঘনীভূত করবেন নাকি জ্বীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকবেন।
আইইএ এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বৈশ্বিক জোট ওপেক। জোটের পক্ষ থেকে অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে, আইইএর এমন প্রতিবেদন প্রকাশ তেল উৎপাদনকারীদের জন্য মানহানিকর।
কপের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট সুলতান আল–জাবেরের দিকেও সবার নজর থাকবে এবার। কারণ, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, জলবায়ু পরিবর্তন সংকট মোকাবিলায় একটি সমঝোতা বা ঐকমত্যে পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি কতটা সততার সঙ্গে কাজ করবেন।
এদিকে বিবিসি দিয়েছে আরেক বিস্ফোরক তথ্য, এবারের জলবায়ু সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত নাকি সম্মেলনের সুযোগে কয়েকটি দেশের সঙ্গে জীবাশ্ব জ্বালানি বিক্রির চুক্তি করবে! এমনকি চীনের কাছে তরলীকৃত গ্যাস বিক্রি চুক্তির একটি খসড়াও কপিও নাকি ফাঁস হয়েছে!
যদিও এসব দাবি নাকচ করে আল-জাবের মনে করেন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার বিষয়টি ‘অবশ্যম্ভাবী'। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তেল শিল্পকেও জড়াতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। তাই তেল ও গ্যাস উত্তোলনের সময় কার্বন নির্গমন কমাতে কোম্পানিগুলোর সহায়তা চান আল-জাবের। সে কারণে এবারের সম্মেলনে আগের যে কোনো সম্মেলনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যবসায়ী অংশ নিচ্ছেন।
ক্ষতিপূরণ তহবিলের কী হলো?
আশঙ্কা করা হয়েছিল এই পরিস্থিতি দুবাই সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তহবিলের দাবি চাপা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে বৃহস্পতিবার সম্মেলনের শুরুতে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ভিত্তিক ক্ষতিপূরণ তহবিল চালুর বিষয়টি সর্বসম্মতিতে অনুমোদিত হয়েছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। তবে একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, সেটি হলো উন্নত দেশগুলো কে কতটুকু ক্ষতিপূরণ দেবে। যা গতবারের সম্মেলন থেকেই ধনীদেশগুলোর মধ্যে বেশ বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিবিসি বলছে, ভারত, চীন ক্ষতিপূরণ তহবিলে অন্যান্য উন্নত দেশের সমপরিমাণ অর্থায়ন করতে রাজি নয়। তাদের দাবি উন্নত বাকী দেশগুলোর তুলনায় তারা কম গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপন্ন করে। চীনের এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে এই তহবিলে অর্থায়ন করায় গড়িমসি করার সুযোগ দিতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অপরিবর্তনীয় ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তার জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলো এই অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। গত বছর মিসরের শার্ম আল-শেখ-এ অনুষ্ঠিত কপ-২৭ শীর্ষ সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নতদেশগুলোর সঙ্গে কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিল। গত বছর কপ ২৭-এ দুই বছরের মধ্যে লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
এছাড়া কার্বন নিঃসরণে বিশ্বের শীর্ষ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও দ্বিতীয় শীর্ষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কপ-২৮ সম্মেলনে আসছেন না। তাদের অনুপস্থিতিতে আদৌ বিশ্বনেতারা জীবাশ্ম জ্বালানি ও ক্ষতিপূরণ তহবিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
বছর বছর ঘটা করে জলবায়ু সম্মেলন আয়োজনের পরও উন্নত দেশগুলো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। তাই জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনকে ‘ব্লা ব্লা ব্লা’ অর্থাৎ কেবল কথাতেই, কাজে নয় বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ।