‘বিতর্কিত’ কূটনীতির প্রতীক কিসিঞ্জার

জার্মানিতে ইহুদিবিদ্বেষ বাড়ায় ১৯৩৮ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের পরিবার পাড়ি জমিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। পরে তিনি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত কূটনীতিকে পরিণত হন যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিদেশে সরকার উৎখাত, বর্ণবাদী প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের পক্ষাবলম্বনসহ নানা বিতর্কিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯২৭ সালে ইহুদি পরিবারের জন্মগ্রহণকারী হেনরি কিসিঞ্জার বিশ্বব্যাপী ‘বিতর্কিত মার্কিন কূটনীতির’ প্রতীক বনে যান।

প্রথম জীবনে হেনরি কিসিঞ্জার মার্কিন সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি হার্ভার্ডের লেকচারার হন। ১৯৬২ সালে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১৯৬৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে নিয়োজিত হন কিসিঞ্জার। এরপর সাবেক প্রেসিডেন্ট জেরার্ড ফোর্ডের প্রশাসনেও তিনি কাজ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিকত্বের ছাপ ফেলেন। স্নায়ুযুদ্ধের বৈরিতা এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস চুক্তির (সল্ট)’ তিনিই রূপকার। ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ করার কৃতিত্ব হিসেবে তাকে দেওয়া হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার। অবশ্য এই যুদ্ধে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলেন অনেকেই।

কিসিঞ্জারের জীবনে অন্যতম বদনামগুলোর একটি হচ্ছে তিনি বিশ্বব্যাপী বামপন্থি সরকার উৎখাত করা এবং কমিউনিস্ট সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে বিতর্কিত কাজে লিপ্ত ছিলেন। তিনি কম্বোডিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির ঘাঁটিগুলোয় বোমাবর্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সময় লাওস ও কম্বোডিয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর অ্যালেন্দেকে উৎখাতে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন তিনি।

সত্তরের দশকের শুরুতে কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফরে গিয়ে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপনের পথনকশা তৈরি করেন। বিশ্লেষকরা বলেন, ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে গতিশীলতার কারণে এশিয়ায় মস্কোর প্রভাব বাড়ার শঙ্কা থেকে তিনি বেইজিংমুখী হন। অবশ্য এমনও মনে করা হয়, ভিয়েতনামের যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন পরাজয় ঠেকাতে চীনের দ্বারস্থ হন তিনি। মূলত ওই সময় চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বর্তমান সময়ে বেইজিংয়ের অন্যতম বড় পরাশক্তি হওয়ার কারণ।

ইন্দোনেশিয়া কর্তৃক পূর্ব তিমুরে আগ্রাসন চালানোই যেমন তার সমর্থন ছিল, তেমনি সাইপ্রাসের এক-তৃতীয়াংশ দখলে নেওয়ার সময়ও তিনি তুরস্ককে সমর্থন দেন। আবার আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধেও তিনি গোপন ভূমিকা রাখেন। আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের পক্ষ নেন। ১৯৭৩ সালে ইওম কিপুর যুদ্ধে আরব দেশগুলোকে মোকাবিলায় ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল তারই পরামর্শে। আবার তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করেন। তার সময়েই মিসরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের গোড়াপত্তন হয় এবং তা পরে গভীর হয়।