টলটলা রোদের তাপে যেন পুড়ছে দুবাই। আজ দেখলাম দিনের বেলা তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি। কিছু খেজুরগাছ, কাঁটা ঝোপ আর রসালো পাতার গাছ ছাড়া এখনো চোখে কিছু পড়েনি। ৩০ নভেম্বর থেকে দুবাইয়ের এক্সপো সিটিতে শুরু হয়েছে ২৮তম জলবায়ু সম্মেলন। গতকাল শুক্রবার থেকে চলছে ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিট’, শেষ হবে আজ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ অধিক কার্বন নিঃসরণকারী রাষ্ট্রের প্রধানদের অনেকেই এই ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে অংশ নিয়েছেন। দুবাই জলবায়ু সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দুঃসহ উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টি আবারও গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছেন। চলতি বছরকে ইতিহাসের উষ্ণতম বছর উল্লেখ করে জলবায়ু সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ^কে তৎপর ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এখন পর্যন্ত জলবায়ু সম্মেলনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলো হলো জীবাশ্ম জ¦ালানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানো, তহবিল, অর্থায়ন এবং সুরক্ষা। এসব নিয়ে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে বহু তর্ক, সন্ধি আর বাহাস। পৃথিবীর তাপমাত্রার পারদরেখাকে আর বাড়তে না দেওয়ার জন্যই এত চিৎকার। ২০১৫ সালে করা প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী এ পারদরেখা যেন ১.৫ ডিগ্রি না পেরোয় এ বিষয়ে বিশ^নেতারা অঙ্গীকার করেছেন।
উষ্ণতা বাড়ার কারণে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে খরা, পানির উৎস কমছে নানাভাবে। খরাকে আফ্রিকার অন্যতম জলবায়ুজনিত ঝুঁকি হিসেবে দেখা হলেও পৃথিবী জুড়ে যেন খরা বিস্তৃত হচ্ছে। দুবাই কি দিনাজপুর, দোহা কি দক্ষিণ আফ্রিকাÑ সর্বত্র। কেন্দ্রীয় আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন থেকে সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী সেলেস্টিন। দীর্ঘদিন ধরে ক্যামেরুনের গ্রামীণ কৃষকসমাজের সঙ্গে খরা মোকাবিলা নিয়ে কাজ করছেন। সেলেস্টিন জানান, আগে ক্যামেরুনে দুটি শুকনো মৌসুম এবং দুটি বর্ষা মৌসুম ছিল। মার্চ থেকে জুন এবং আগস্ট থেকে নভেম্বর ছিল বর্ষা মৌসুম। আবার জুন থেকে আগস্ট এবং নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে মার্চ ছিল খরা মৌসুম। কিন্তু এসব মৌসুম এখন বদলে গেছে। এখন খরা মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে। ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত খরা হচ্ছে। বিস্ময়করভাবে এখন ডিসেম্বরে অকাল বৃষ্টি ও বড় ধরনের বর্ষণ হচ্ছে। এমনকি সেলেস্টিন যখন দুবাই আসার জন্য রওনা দেন সেদিনও, নভেম্বরের শেষে বৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ইয়াউন্দে থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ওকুলা গ্রামে তিনি বড় হয়েছেন। গ্রামের কৃষকরা মূলত শিমুল আলু বা কাসাভা চাষ করে। পাশাপাশি তারা ভুট্টা, আলু, চীনাবাদামও চাষ করে। খরার কারণে উৎপাদন কমছে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে খাদ্য অভাব তৈরি হচ্ছে। কিন্তু খরার কারণে জটিল হওয়া সামাজিক পরিবর্তনগুলো সেলেস্টিনকে বেশি আতঙ্কিত করে। খরা ও পানির অভাবে বহু জমি অনাবাদী হয়ে পড়ছে, মাটি তার শক্তি হারাচ্ছে। কৃষিজমি নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা বিবাদ ও দ্বন্দ্ব। এসব দ্বন্দ্ব সামাজিক সংঘাতও তৈরি করছে। এসব কারণে দেখা গেছে, এ প্রজন্মের বহু তরুণ ও যুবক আর গ্রামে থেকে কৃষিকাজ করতে আগ্রহী নয়। তারা গ্রাম ছাড়ছে। শুধু সুবিধাবঞ্চিত গরিব গ্রামীণ পরিবারগুলোই কৃষিকে এখনো ধরে রেখেছে। সেলেস্টিন যখন আলাপ করছিলেন তখন আমার সামনে ক্যামেরুন নয়, ওকুলা গ্রাম নয়, ভেসে উঠেছিল বাংলাদেশ। বরেন্দ্র অঞ্চলের ঝিনাপাড়া, মু-ুমালা, বাধাইড় গ্রামগুলো। তীব্র খরায় ছটফট করা সেই চিত্র জাতিসংঘ কোনোদিনও দেখবে কি না, জানি না। ক্রমেই পানিশূন্য হয়ে ওঠা বরেন্দ্র অঞ্চলে সামাজিক সংঘাতগুলো কোন পর্যায়ে যাচ্ছে, তা কি আমরা ভেবে দেখছি? শুধু সেচের জন্য পানি না পেয়ে খরাপ্রবণ বাংলাদেশের রাজশাহীতে আত্মহত্যা করেছেন তিন সাঁওতাল কৃষক। দুজনের মৃত্যু ঘটেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এ খরাসংকট মোকাবিলায় তৎপর না হলে আগামীতে ক্যামেরুনের ওকুলা কি বাংলাদেশের মু-ুমালাÑ সর্বত্র সামাজিক সংঘাত ও অস্তিতা বাড়বে। দুবাই জলবায়ু সম্মেলন এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে কি না, আমরা এখনো তা জানি না। মনে আছে, দিনের পর দিন পানি না পেয়ে তানোরের মু-ুমালার মাহালি নারীরা মাটির কলস নিয়ে রাজশাহী শহরে দাঁড়িয়েছিলেন। চিচিলিয়া হেমব্রম, রিনা টুডু, মণিকা টুডু কিংবা জেসটিনা টুডুরা মাহালি ভাষায় চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘জিউই বাঞ্চাও লাগিতে দা হাতোই আলেঃ’। বাংলা করলে দাঁড়ায়Ñ ‘জীবন বাঁচাতে হলে আমাদের পানি দাও।’ জানি না মাহালি ভাষার এই পানি-আর্তনাদ জাতিসংঘ শুনেছে কি না।
তাপপ্রবাহ কিংবা খরার দুশ্চিন্তা নিয়ে ইথিওপিয়ার প্যাভিলিয়নে ঢুকেই কেমন একটা স্নিগ্ধ সবুজ শীতল অনুভূতি হলো। বেশ বড় আয়োজনে, গোছানো, সাবলীল, সৃজনশীল একটা প্যাভিলিয়ন। খরা মোকাবিলায় এখানে ইথিওপিয়া তাদের দৃষ্টান্তগুলো উপস্থাপন করেছে। প্যাভিলিয়নের বাইরে কফি, ভুট্টা, আম, কলা, কমলাসহ নানা ধরনের ভেষজ ও বুনো গাছের চারা দিয়ে বাগান তৈরি করেছে। দৃষ্টান্তগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো তেফেরা টেডেস গেনেটের সঙ্গে। ইথিওপিয়া সরকারের প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের ‘কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ কর্মকর্তা’ হিসেবে কাজ করছেন তিনি। গেনেট মূলত খরা মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় তিনটি দৃষ্টান্ত বা প্রকল্প উদাহরণসমেত প্রায় হাতেকলমে দীর্ঘসময় নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনা করলেন। প্রথম দৃষ্টান্তটির নাম ‘গ্রিন লিগ্যাসি ইনিশিয়েটিভ’। ২০১৯ সালে সরকার এটি গ্রহণ করে। আট বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে তারা প্রায় ৫০ বিলিয়ন মানে ৫ হাজার কোটি গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি হাতে নেয়। চার বছর করে প্রকল্পটির দুটি পর্যায়। এ পর্যন্ত তারা ৩২ দশমিক ৫ বিলিয়ন গাছের চারা রোপণ করেছে। লেবু, কমলা, পেঁপে, কলা, আম, ফল ও কাঠজাতীয় গাছের চারাকে প্রাধান্য দিয়েছে। প্রায় দুই কোটি মানুষ গাছরোপণ ও সুরক্ষায় অংশ নিয়েছে। দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটির নাম ‘জলবায়ুসহিষ্ণু গম চাষ’। এটি শুরু হয় ২০২০ সালে। পূর্বে নদী ও বৃষ্টির পানির ওপর ইথিওপিয়ার চাষাবাদ নির্ভর করলেও এখন পানিই প্রধানতম সংকট। তারা ভূ-গর্ভস্থ পানিসেচকে গম আবাদের জন্য বেছে নেয়। ভূ-গর্ভস্থ পানি, শুনেই আমার চোখ কেঁপে উঠল। গেনেট আমার চোখের ভাষা ধরতে পারলেন। জানালেন, প্রথম প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের লাগানো গাছ ও সবুজবলয় মূলত ভূ-গর্ভে আবার পানি ফিরিয়ে দিচ্ছে, তাই এতে পানির স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। তৃতীয় প্রকল্পটির নাম তাদের ভাষায় তিনি আমার খাতায় লিখে দিলেন। ‘ইয়ে লিমাট টিরুফাট’ প্রকল্পটির মাধ্যমে মূলত গ্রামীণ পরিবারে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাণিসম্পদ সুরক্ষা কর্মসূচি শুরু হয়। এতে জনগোষ্ঠী ডিম, দুধ, মুরগির মাংস, মাছ, মধু উৎপাদন করতে পারছে। গেনেটের কাছে জানতে চাই এসব দৃষ্টান্ত কি সুফল আনতে পারছে? জানালেন, জনগোষ্ঠী উৎপাদন করছে, নিজেরা খেয়ে বিক্রি করতে পারছে। সবকিছু মিলে খরা মোকাবিলায় একটি স্থানীয় দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছে ইথিওপিয়া। এমনকি এসব দৃষ্টান্ত ইথিওপিয়ার আশপাশের রাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মজবুত করছে। জিবুতি, দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়া ও ইরিথ্রিয়াতে তারা বহু গাছের চারা দিয়েছেন। সেসব দেশও ইথিওপিয়ার দৃষ্টান্তকে অনুকরণের চেষ্টা করছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে খরা মোকাবিলার এসব প্রকল্প ‘গরিব ও রুগ্ণ’ হিসেবে পরিচিত ইথিওপিয়া কীভাবে বাস্তবায়ন করছে? কোনো ধনী রাষ্ট্র, বহুপাক্ষিক ব্যাংক নাকি কোনো বহুজাতিক কোম্পানি? মোটেও না, গেনেট হাত মুঠো করে জবাব দিলেন, রাষ্ট্র ও জনগণ মিলে এই কাজ বাস্তবায়ন করছে। নিজের টাকায়। এই প্রকল্পে যুক্ত কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত স্বেচ্ছায় কাজ করছে। বুঝতে পারলাম এটাই হলো এ প্রকল্পের মূল শক্তি। কেন এ প্যাভিলিয়নে ঢুকতেই একটা স্নিগ্ধ সবুজ অনুভূতি হয়েছে তাও আন্দাজ হলো। ইথিওপিয়ার এই গল্প আমাকে বাংলাদেশের পদ্মা সেতুর কাছে টেনে নিয়ে গেল। গেনেটকে জানালাম, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে পদ্মা সেতু তৈরি করেছে। গেনেটের তরতাজা হাসিমুখ দেখে মনে হলো সেও বাংলাদেশের শক্তিকে আন্দাজ করতে পেরেছে। বাংলাদেশ নিশ্চয়ই পারবে, বরেন্দ্র অঞ্চলের জনগণকে একত্র করে খরা মোকাবিলায় আরেক বৈশি^ক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে।
ইথিওপিয়ার এ গল্প প্রমাণ করছে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শুধু তহবিল নয়, আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে বিশে^র ছয়টি দেশ ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের জন্য ৪২৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার অঙ্গীকার করেছে। একক রাষ্ট্র হিসেবে সবচেয়ে বেশি তহবিলের অঙ্গীকার করেছে জার্মানি ও আয়োজক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১০০ মিলিয়ন ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১২৫ মিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ১৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন এবং জাপান ১০ মিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার করেছে। অবশ্যই আমাদের তহবিল ও অর্থায়ন লাগবেই, কিন্তু খরা মোকাবিলায় ইথিওপিয়ার মতো দুনিয়া জুড়ে জেগে থাকা লাখো-কোটি জলবায়ু জন-অনুশীলনগুলোকেও জাগিয়ে রাখা জরুরি।
লেখক ও গবেষক