কয়েক মাস ধরে নিয়মিতই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের জামিন নামঞ্জুর, রিমান্ড আর সাজার রায় হচ্ছে। অন্যদিকে বিপরীত নজিরও দেখা গেল। বিএনপির বহিষ্কৃত ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমরের জামিন পাওয়ার কয়েক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কারামুক্তি ও পরদিন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা, সমালোচনা ও গুঞ্জন চলছে।
আইনজীবীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, প্রায় তিন মাসে (গত ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত) শুধু ঢাকার আদালতগুলোতে ৩০টির বেশি মামলায় বিএনপির ছয়শোর বেশি নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগই ৫ থেকে ১২ বছর আগের। অন্যদিকে নাশকতার একই মামলায় একদিকে কারও জামিন হচ্ছে আবার কারও জামিন নামঞ্জুর হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির শীর্ষ নেতা ও দলটির আইনজীবীদের অভিযোগ, বিএনপিকে নির্বাচন থেকে শুধু দূরে সরিয়ে রাখা নয়, আদালতকে ব্যবহার করে দলটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার।
রাজধানীর নিউমার্কেট থানার একটি নাশকতার মামলায় গত ৪ নভেম্বর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরকে গ্রেপ্তারের পর তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তবে গত বুধবার শাহজাহান ওমর জামিন পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কারাগার থেকে মুক্তি পান। এর পরদিন তিনি ঝালকাঠি-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় বেশ কিছু মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলার মামলায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ দলটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জামিনের আবেদন একাধিকবার নামঞ্জুর হয়েছে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাহজাহান ওমর নিউমার্কেট এলাকায় বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার হন। তার মতো দলের একাধিক নেতাকে একই ধরনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও আর কাউকে জামিন দেয়নি আদালত। এতে প্রমাণ হয়, আদালত সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে।’ তার দাবি, ‘এখন নির্বাচনের আগে একই মামলায় দুই-একজনের জামিনের বিষয়টি প্রমাণ করে আদালত সবার ক্ষেত্রে একই আদেশ দেয় না। আবার একই আদালত একই অপরাধে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রায় দেয়। তাতে প্রমাণ হলো যে আদালত সবার ক্ষেত্রে সমান নয়।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কারাবন্দি নেতাদের স্বজনদের উদ্যোগে মানববন্ধনে আমি বলেছিলাম, নির্বাচনে অংশ নিতে শাহজাহান ওমরের পরিবারকে নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। তারপরই তিনি জামিন ও মুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।’
শাহজাহান ওমরের জামিন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারও জামিন দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। এ নিয়ে কোনো মন্তব্য বা হস্তক্ষেপ করা সমীচীন হবে না।’
গত ২৭ নভেম্বর খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা (এখন বহিষ্কৃত) একরামুজ্জামান সুখনের পক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়। এর আগে তিনি বিস্ফোরক মামলায় জামিন পান। ওই দিন স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে জামিন পেয়েছি। আমার পক্ষে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে।’ একরামুজ্জামান সুখনের প্রথমে জামিন ও মনোনয়নপত্র সংগ্রহের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার নামে নাশকতার মামলা ছিল। আদালত তাকে জামিন দিয়েছে। আমরা ধারণা করছি, সরকার তাকে নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি করিয়েছিল। এরপরই তার জামিনের ব্যবস্থা করা হয়।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতিতে মতপার্থক্য, মতভেদ ও বিরোধ থাকবে। কিন্তু আমার ৫০ বছরের বেশি রাজনৈতিক জীবনে রাজনীতিকে কেন্দ্র করে এত মামলা, গ্রেপ্তার ও সাজা দেখিনি। একটা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতীতে কোনো সরকার বিচার বিভাগকে এভাবে ব্যবহার করেনি। এভাবে দ্রুত বিচার ও সাজা হয়নি।’
‘এত ত্বরিত বিচার ও সাজা আর দেখা যায়নি’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, পৃথিবীজুড়ে শাসক দলগুলো বিরোধী মত ও পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ ও নিবর্তনের চেষ্টা করে। বাংলাদেশে অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। কিন্তু রাজনীতি, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাত্র কয়েক মাসে মামলা ও সাজার এমন পরিস্থিতি দেশে অতীতে কখনো দেখা যায়নি।
কয়েক মাস ধরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলা ও বিচার নিয়ে কিছু অভিনব বিষয় নিয়ে অভিযোগ করছেন বিএনপির আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে ‘গায়েবি’ মামলা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ৫ থেকে ১৩ বছরের পুরনো মামলা রাতারাতি সচল করা, রাতের বেলায়ও সাক্ষ্যগ্রহণ, শুধু পুলিশের সাক্ষ্য নিয়ে বিচারকাজ নিষ্পত্তি, মৃত ও ‘গুম’ হওয়া ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা এবং সাজার মতো ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। যদিও সরকারদলীয় শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলে আসছেন, বিএনপির যাদের নামে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে সাজা দিচ্ছে আদালত। একই সঙ্গে এসব মামলার প্রস্তুতি ও উচ্চ আদালতে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ ও সময় তারা পাচ্ছেন না।
বিএনপির নেতাকর্মীদের সাজার রায় নিয়ে দলটির আইনজীবীদের অভিযোগের বিষয়ে পিপি আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘তাদের অভিযোগ অমূলক। সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদেরই কেবল সাজা হচ্ছে। এখানে কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপির এসব ধর্তব্যের বিষয় নয়। আদালত তথ্য ও সাক্ষ্যের মাধ্যমে রায় দিচ্ছেন।’
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ নভেম্বর এক দিনেই ঢাকার বিভিন্ন আদালতে পাঁচটি মামলার রায়ে ১৭৯ জনকে সাজা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল গত ২৯ নভেম্বর দাবি করেছেন, গত তিন মাসে সারা দেশে ৩৫ মামলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ৬৩৬ জন নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, আইন ও আদালতের অনেকটা চলছে ঔপনিবেশিক পদ্ধতিতে। এখানে শাসকরা পুলিশ ও আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে শাস্তি দেয় ও নিবর্তন চালায়। রাজনীতিতেও এখন অর্থ আর পেশিশক্তির দাপট থাকায় সেখানে নিবর্তন ও সাজাকেই অস্ত্র হিসেবে মনে করা হয়।’ এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের বাইরের কিছু নয়। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের অপরিহার্য অঙ্গের কোনো একটির বিরুদ্ধে নেতিবাচক কার্যক্রম থাকলে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই যে শত শত মানুষের সাজা এগুলো রাজনৈতিক কি না, এ ধরনের প্রশ্ন তো সাধারণ মানুষ করছে। এগুলো আইনের শাসনের মাধ্যমে বিচারের সাজা, এটা কিন্তু অনেক মানুষ বিশ্বাস করছে না। রাজনীতিতে এমন পরিস্থিতি তো আগে কখনো হয়নি। এই জায়গাটাতে একটা শঙ্কা যে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গ বিচারব্যবস্থা নিয়ে যদি জনগণের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয় তাহলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কী হবে, এটা নিয়ে চিন্তা করা রাজনীতিবিদদের জন্য জরুরি।’