চীন-পাকিস্তানের নীতি বাস্তবায়ন করেছে মিয়ানমার

মিয়ানমার বাংলাদেশের নিটকতম প্রতিবেশী। ভারতের পর এ দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তঘেঁষা আরাকান (রাখাইন) রাজ্যে ও রেঙ্গুন (ইয়াঙ্গুন) শহরের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে চট্টগ্রামের জনগণের সম্পর্ক শত বছরের। আরাকানের সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতিগত সাদৃশ্য রয়েছে। অনেকের রয়েছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক। যে কারণে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় আরাকানের বাসিন্দারা পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিল। যদিও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার আগে থেকেই দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া জেনারেল অং সান সরকারি অফিসে সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে নির্মমভাবে নিহত হন। এরপর দেশটিতে পরিপূর্ণ সেনা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে দেশটিতে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে চীনা প্রভাব। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালে দেশটির পুরো কর্তৃত্ব নিয়ে নেয় মিয়ানমার। ১৯৭১ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন সেনাপ্রধান নে উইন। তিনি চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যে কারণে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে মিয়ানমারের অবস্থান ছিল বাংলাদেশবিরোধী।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চলাইট দুুই ভাগে বিভক্ত ছিল। অভিযানের একটি অংশ ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক আর পরের অংশের বিস্তার ছিল দেশব্যাপী। নৃশংস এই অভিযানে চট্টগ্রামে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। যে কারণে চট্টগ্রাম দখলে নিতে বেশ সময় লেগে যায়। ১১ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রবেশ করে পাকিস্তানি বাহিনী আর সমুদ্র শহর কক্সবাজারের দখল নেয় ২৭ এপ্রিল। এরপরই শুরু হয় নির্বিচারে হত্যা আর লুণ্ঠন। এমন পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে নাফ নদী পার হয়ে অনেক মানুষ প্রবেশ করে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে। এ সময় পলায়নপর বাঙালিদের আশ্রয় দিলেও ক্যাম্পে মোটামুটি অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল আশ্রয়প্রার্থীদের। দেশটির বলিবাজার, সাববাজার, নাখারো, ঢেকিবানিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঙালিরা আশ্রয় নিয়েছিল। সীমিত পরিসরে খুব সামান্য খাদ্যসহায়তায় শরণার্থীদের অবর্ণনীয় জীবনযাপন করতে হয় মিয়ানমারের মাটিতে। এ সময় মুক্তিকামী বাঙালিরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রস্তুতি নিলে মিয়ানমারের সেনা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দেয়। এমনকি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের পরিকল্পনার অভিযোগে অনেক বাঙালিকে গ্রেপ্তারও করেছিল দেশটির সরকার। ফলে অনেক রাজনৈতিক নেতা মিয়ানমারে আশ্রয় নিলেও পরে আবার দেশে চলে আসেন। বলা যায়, মিয়ানমারে খুবই প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল বাঙালিদের। তবে মিয়ানমারে আশ্রয় নেওয়া বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবস্থা খুব একটা খারাপ ছিল না। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে প্রায় ২০ হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়েছিল।

চীনা নীতির বাস্তবায়ন ও পাকিস্তানকে সহযোগিতা

ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে চীন-মিয়ানমারের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ২০২৩ সালের মতো ১৯৭১ সালেও চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সুসম্পর্ক ছিল। আর ওই সময় চীনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল পাকিস্তান। মা-ও সে তুংয়ের চীন ওই সময় পাকিস্তানকে অর্থ ও সামরিক সাহায্য দিয়েছে অকাতরে। তাই স্বভাবতই মিত্র হিসেবে মিয়ানমার বাংলাদেশ প্রশ্নে চীনা নীতি বাস্তবায়ন করেছে। এ সময় চীনের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে জ্বালানি ও খাদ্যসহায়তা দিয়েছে মিয়ানমার। এমনকি পরাজয়ের আগে অনেক পাকিস্তানি সেনা বাংলাদেশের ভূ-খন্ড থেকে পালিয়ে মিয়ানমারে আশ্রয় নেয়। পরে সেখান থেকে চীনের সহায়তায় ওই সেনাদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে। সিদ্দিক সালিক বইটির তৃতীয় অধ্যায়ের শেষ পরিচ্ছেদে আত্মসমর্পণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তাতে আত্মসমর্পণের আগের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘চতুর্থ অ্যাভিয়েশন স্কোয়াড্রনের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল লিয়াকতকে ৮ জন পাকিস্তানি নার্স ও ২০টি পরিবারকে মিয়ানমারের আকিয়াবে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বরের প্রথম প্রহরে দুটো হেলিকপ্টার মেজর জেনারেল রহিম ও অন্যদের মিয়ানমারে পৌঁছে দেয়। কিন্তু অপেক্ষমাণ নার্সদের আর মিয়ানমারে নেওয়া হয়নি।’  বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে জানা যায়, শুধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল লিয়াকতই নন, মেজর আইজাজ, ক্যাপ্টেন জারিফসহ বিভিন্ন কোরের স্টাফ ও অফিসাররা আত্মসমর্পণের আগে মিয়ানমারে আশ্রয় নেন। মূলত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী সেনাদের জন্য একটি করিডর ছিল মিয়ানমার।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যার শিকার হয়ে দেশটির অন্তত ১২ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে বসবাস করছে। বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয়, খাদ্য ও নিরাপত্তা দিয়ে বিশ্বে অনন্য নজির স্থাপন করেছে। যদিও ১৯৭১ সালে বিপদাপন্ন বাঙালিদের পাশে দাঁড়ায়নি রোহিঙ্গারা। তাদের আনুগত্য ও সমর্থন ছিল পাকিস্তানের প্রতি; বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পলায়নপর বাঙালিদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শত্রুতামূলক আচরণের ঘটনা পাওয়া যায়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা