গতকাল শনিবার সকাল ৯টা ৩৫ মিনিট। হঠাৎ কেঁপে উঠল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। আতঙ্কে অনেকেই ভবন ও ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসেন।
স্বজনদের খবর নিতে থাকেন থাকেন কেউ কেউ। সামাজিক মাধ্যমেও নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকেন সবাই। তবে এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। কুমিল্লার একটি পোশাক কারখানায় হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে আহত হয়েছে শতাধিক কর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল থেকে লাফিয়ে পড়ে পায়ে আঘাত পেয়েছেন এক শিক্ষার্থী। এ ছাড়া ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলের পলেস্তারা খসে পড়া ও দরজার কাচ ভাঙার
ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি হলে দেখা দিয়েছে ফাটল।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বলছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬। তারা অবশ্য প্রথম দফায় ভূমিকম্পের মাত্রা ৫ দশমিক ৮ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ কেন্দ্র (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫। আর এর কেন্দ্র ছিল ঢাকা ৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। গভীরতা ছিল ৩৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার। অবশ্য ভারতের সিসমোলজি সেন্টারের তথ্যমতে এর গভীরতা ছিল ৫৫ কিলোমিটার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের গভীরতা বেশি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কম হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্ত অনুযায়ী, প্রান্তীয় এলাকা যেমন বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার বা সিলেট এলাকায় এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে এই মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড নেই প্রায় ২৫০ বছরের ইতিহাসে। এর আগে ঢাকার দোহার কিংবা রূপগঞ্জেও ভূমিকম্প হয়েছিল, তবে সেগুলো ছিল ৫ রিখটার স্কেলের নিচে। তাহলে এবার কেন সাড়ে ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলো সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল পলি জমা হয়েই। কিন্তু এই পলির নিচে শক্ত মাটির একটি স্তর রয়েছে। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পটি মাটির অনেক গভীরে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পাললিক শিলার নিচের শক্ত মাটিতে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এখানে কোনো প্লেট বাউন্ডারি বা সাবপ্লেট নেই। যদি সাবপ্লেটে হতো তাহলে একাধিক ভূমিকম্প হতো। এখানে একটি ভূমিকম্পের মাধ্যমে মাটির নিচের শক্তি বের হয়ে এসেছে।’ তিনি বলেন, আর বেশি গভীরে উৎপত্তি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার গভীরে হলে সারা দেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতো।
দেশের পূর্বদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে তিনটি এবং ময়মনসিংহে মধুপুর ও সিলেটে ডাউকি এই পাঁচটি ফল্ট লাইন থাকলেও লক্ষ্মীপুর এলাকায় আরও একটি ফল্ট লাইন রয়েছে বলে জানান দেশের অন্যতম ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেহেদী আনসারী। তিনি বলেন, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এই এলাকাটি হলো দেশের উত্তর-পূর্ব (সিলেট) এবং দক্ষিণ-পূর্ব (চট্টগ্রাম-কক্সবাজার) এলাকায় থাকা দেশের দুটি অভ্যন্তরীণ প্লেটের সংযোগস্থল। তাই এই এলাকায় ভূমিকম্প হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই এলাকাটি অভ্যন্তরীণ প্লেটের ফল্ট লাইনের মধ্যেই রয়েছে।
একই মন্তব্য করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এত বড় ভূমিকম্প কোনোভাবেই ফল্ট লাইনের বাইরে হতে পারে না। আর ফল্ট লাইন তো একটি লাইন ধরে হয় না। একেকটি ফল্ট লাইনের পরিধি ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটারব্যাপী হয়ে থাকে। যেহেতু দেশের পূর্বপ্রান্ত দিয়ে মেইন ফল্ট লাইন গিয়েছে, সে হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছেই (রামগঞ্জ থেকে পূর্বদিকে চৌদ্দগ্রাম প্রান্তে ভারত সীমান্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে) এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এটা সত্য যে, এটা প্রধান ফল্ট লাইন বরাবর হয়নি। বিক্ষিপ্তভাবে একটি পকেট যেখানে শক্তি জমা হয়েছিল, সেই শক্তি বের হয়ে এসেছে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আনসারী বলেন, ২০০৯ সালের ইউএনডিপির গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের পূর্বপ্রান্ত পুরোটাই ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আর পূর্বপ্রান্তে ভূমিকম্প হলে ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকাও ঝুঁকিতে থাকবে। যেহেতু ২৫০ বছরের ইতিহাসে দেশে বড় আকারের ভূমিকম্প হয়নি, তাই এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে।
কিন্তু এ ধরনের ভূমিকম্পের মাধ্যমে যদি শক্তি বের হয়ে আসে, তাহলে বড় ভূমিকম্প কমে আসতে পারে বলে জানান ড. জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের মাধ্যমে যদি মাটির অভ্যন্তর থেকে শক্তি বের হয়ে আসে, তাহলে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এবং দেশের অভ্যন্তরে অতীতের ভূমিকম্পে তা দেখা গেছে।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে আর্থকোয়েক সেন্টার গড়ে তুলেছিলেন। রামগঞ্জ ভূমিকম্প প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশের পাঁচটি ফল্ট লাইন বরাবর ভূমিকম্পের উৎপত্তি হবে। কিন্তু এ কারণে সারা দেশ ঝুঁকিতে থাকবে। তাই দেশের সব শহরের ভবন ছয় মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় আকারে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরকেও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।
সবার আগে আমাদের ভবনগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রফেসর ড. মেহেদী আনসারী বলেন, ‘দেশের দুই প্রধান শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামের ভবনগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোন ভবন কত মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় তা নির্ধারণ করার পর এগুলোর শক্তি বাড়াতে হবে। এজন্য জরিপকাজ পরিচালনা করা দরকার। যেভাবে গার্মেন্টস ভবনগুলো মজবুতকরণ করা হয়েছিল।’
ঢাবির হলে থেকে লাফিয়ে শিক্ষার্থী আহত : সারা দেশে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হলে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়েছে, তা ছাড়া রিডিং রুমের জানালার গ্লাস, দোতলার বারান্দার একটি অংশও ধসে পড়েছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে কেউ গুরুতর আহত না হলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন কয়েকজন। এ ছাড়া মাস্টারদা সূর্যসেন হলের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে আহত হয়েছেন শিক্ষার্থী মো. মিনহাজ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। হলের ২৩৩ নম্বর কক্ষে থাকতেন তিনি। চিকিৎসার জন্য মিনহাজকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ভূমিকম্প নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেছেন, ‘এ ধরনের ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই। তবে বাংলাদেশ যেহেতু ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, এজন্য যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের বড় কিংবা মাঝারি ভূমিকম্প হতে পারে। সুতরাং, তীব্রতা বিবেচনায় রেখে আমাদের ভবন নির্মাণ করা উচিত।’
চৌদ্দগ্রামে শতাধিক পোশাকশ্রমিক আহত : ভূমিকম্পে সারা দেশের মতো কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামও কেঁপে ওঠে। এ সময় উপজেলার ছুপুয়া আমির শার্টস নামের গার্মেন্টসে আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অর্ধশতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে। তথ্যটি গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় নিশ্চিত করেছেন চৌদ্দগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন লিডার দিদারুল আলম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৯.৩৫ মিনিটের সময় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলে আমির শার্টস গার্মেন্টসের শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করে নামতে চেষ্টা করে। এ সময় গার্মেন্টসটির প্রধান ফটক বন্ধ থাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, গার্মেন্টসটি ধসে পড়েছে। এতে অন্য শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে প্রধান ফটকের তালা ভেঙে বের হওয়ার সময় পদদলিত হয়ে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ আহত হয়।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্মকর্তা ডা. গোলাম কিবরিয়া টিপু বলেন, আহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ১৫ জনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক।
কুবির ৫ আবাসিক হলে ফাটল : ভূমিকম্পের ফলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি আবাসিক হলে ফাটল দেখা দিয়েছে। তীব্র কম্পনে হলগুলো কাঁপতে শুরু করলে শিক্ষার্থীরা বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরে শেখ হাসিনা হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, কাজী নজরুল ইসলাম হল, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল ও নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা যায়। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় এ ঘটনা। এ সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু হলের ২০৯ নম্বর কক্ষের দেয়াল ও ৫০৪ নম্বর কক্ষের সামনের করিডরের মেঝের দুটি টাইলস উঠে গেছে। একই তলায় নতুন ও ব্লকের সংযোগস্থলের করিডরে নতুন ফাটল দেখা গেছে। পাশাপাশি দক্ষিণ ব্লকের দুই করিডরের মাঝের সংযোগস্থলে পাঁচতলাব্যাপী ফাটল ধরেছে। এ ছাড়া নজরুল হলের দোতলার ২০৭ নম্বর কক্ষের দেয়ালে, টিভি রুমের সামনের পিলারের সংযোগস্থলে নতুন ফাটল দেখা গেছে। নওয়াব চৌধুরানী ফয়জুন্নেসা হলের চারতলায় ৪০৩ রুমে এবং পাঁচতলার ৫০৩, ৫১১ রুমে এবং ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া হলের পুরাতন ফাটলগুলো বড় হয়ে গেছে। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের ৫০০১ রুমেও ফাটল দেখা দেয়। এ ছাড়া নতুন নির্মিত শেখ হাসিনা হলের রিডিং রুমে ফাটল দেখা দেয়।
এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার এস এম শহিদুল হাসান জানান, যে ফাটলগুলো দেখা দিয়েছে, সেগুলো এক ভবনের সঙ্গে আরেক ভবনের সংযোগস্থলে। কিন্তু কোনো বিম বা রড ঢালাই যেখানে দেওয়া হয়েছে সেখানে হয়নি। ফলে এখানে ভয়ের কিছুই নেই। এটি সহনীয় মাত্রায়। ভবনেরও কোনো ক্ষতি হয়নি।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে আরও তথ্য দিয়েছেন, কুমিল্লার আঞ্চলিক সংবাদদাতা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি