নানাভাবে দুবাই এক্সপো সিটি আসা যায়। চার দিন ধরে দেখছি বেশিরভাগই মেট্রো ব্যবহার করছেন। যাত্রীদের মনোযোগ মোবাইলের পর্দায়। প্যারিস সম্মেলনে এমন দৃশ্য কিছুটা কম দেখেছিলাম। সময় বদলাচ্ছে। আমাদের জীবনযাত্রা বদলাচ্ছে। এর ভেতরেই কয়েকজন ফিলিপাইন ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ভূমিকম্প নিয়ে বলাবলি শুরু করলেন। ফিলিপাইনের জলবায়ু ও খাদ্য অধিকারকর্মী ইলাং ইলাং এবং আর্নল্ড পেডুলাদের সঙ্গে আলাপে ঢুকে পড়ি। তারা জানালেন, ভূমিকম্প এবং সুনামির মতো বড় ঘূর্ণিঝড়গুলো বাড়ছে ফিলিপাইনে। প্রতিটি দুর্যোগে মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। মৃত্যু ও ধ্বংসের পাশিাপাশি বহু ভাঙচুর ও বিধ্বস্ত দৃশ্য তৈরি হয়। মনপুরা, ভোলা, সিডর, আইলা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ঝুঁকিগুলোও আলাপে আনলাম। শনিবার বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এতে কুমিল্লার ‘আমির শার্ট’ নামের এক পোশাক কারখানার প্রায় ২০০ শ্রমিক আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে গিয়ে আহত হন। অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই দিনে দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাওতে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। সুনামি হতে পারে এমন আশঙ্কায় উপকূলবাসীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশেও দুদিন আগে ঘূর্ণিঝড় মিগজাউমের সতর্ক সংকেত ছিল। ফিলিপাইন ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল এবং বাংলাদেশও ভূমিকম্পঝুঁকি অঞ্চলে অবস্থিত। একই সঙ্গে উভয় দেশই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ অঞ্চল। সব হারিয়ে বা কিছু হারিয়ে বহু মানুষ ফিলিপাইন কি বাংলাদেশে, গ্রাম থেকে শহরে এসে ‘বস্তিবাসী’ হয়ে যাচ্ছে। শহরে এসে আর কোনো সামাজিক পরিচয় থাকছে না। দিনমজুর বা শ্রমিক হচ্ছে নতুন পদবি। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও জনগণের লোকায়ত জ্ঞান প্রমাণ তুলে ধরছে প্রকৃতির এই ওলট-পালট অসুস্থতার নামই জলবায়ু পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া বিপদ ও ঝুঁকিগুলো প্রচুর প্রাণ ও সম্পদহানি তৈরি করছে। মানুষের বাহাদুরিতে বদলে যাওয়া জলবায়ুর কারণে ঘটে চলা এই দুঃসহ নিদারুণ ক্ষয়ক্ষতিই সাধারণভাবে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ইউএনএফসিসিসির ময়দানে।
প্রাণহানি কিংবা কোনো কিছু একেবারেই হারিয়ে যাওয়া হলো ‘লস’। আঘাতপ্রাপ্ত, ক্ষতিগ্রস্ত যা হয়তো আবার সুস্থ বা মেরামত বা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব তা ‘ড্যামেজ’। জলবায়ুজনিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ কিংবা ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের দাবিতে বহুদিন ধরেই মুখর বিশ্ব। দুবাই জলবায়ু সম্মেলন এই তহবিলের অঙ্গীকার দিয়েই শুরু হলো। সম্মেলনের তৃতীয় দিন পর্যন্ত এই তহবিল অঙ্গীকার করা হয়েছে মাত্র ৬৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাশাপাশি একই দিনে যুক্তরাষ্ট্র সবুজ জলবায়ু অর্থায়নে ৩ বিলিয়ন ডলার, নিরাপদ পানির জন্য সংযুক্ত আরব ১৫০ মিলিয়ন ডলার এবং কপ-২৮ প্রেসিডেন্সি জলবায়ুগত স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১ বিলিয়ন ডলার তহবিলের অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশ থেকে আসা ‘ইয়ুথনেট’ আর এই ক্ষয়ক্ষতি তহবিল নিয়ে সম্মেলন জুড়ে নানা মঞ্চে তর্ক চলছে। তহবিল গঠনের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানালেও এর পরিমাণ এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সবাই।
চতুর্থ দিনের সম্মেলনে ‘ক্ষয়ক্ষতি, মানবাধিকার, রাষ্ট্র এবং করপোরেট দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক এক আলোচনার আয়োজন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক, সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস’, আফ্রিকান উইমেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক’, ‘এশিয়া প্যাসিফিক ফোরাম অন উইমেন-ল-অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, ‘সেন্ট্রো পেরুয়ানো ডি এসটুডিওস সোসাইলেস’ ও ফিয়ান। আলোচনায় বক্তারা দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে অঙ্গীকার করা ‘ক্ষয়ক্ষতি তহবিল’কে বিদ্রুপ করে অতিসামান্য এক ‘চিনাবাদাম’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন হাবের’ সামনে দেখা হয় বাংলাদেশ থেকে আসা শিশু-যুব দলটির সঙ্গে। তাদের ভেতর ‘ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের’ নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বললেন, ‘অঙ্গীকার করা লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড দিয়ে একটা বাদামও খাওয়া যাবে না।’ মধ্য তানজানিয়ার তরুণ ভূতাত্ত্বিক ও গবেষক সামিরা কাবডুল্লে আরেক আলোচনায় বলেন, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড তৈরি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, এই ফান্ড কীভাবে, কাদের জন্য এবং কাদের মাধ্যমে ব্যবহৃত হবে, সেটি বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।’ ইকুয়েডরের ‘এভিয়ানা ফাউন্ডেশন’ নামের প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি আন্দ্রেস মর্গো চতুর্থ দিনের ‘ক্ষয়ক্ষতি’বিষয়ক এক অধিবেশনে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজের’ সংজ্ঞায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবন, ঝুঁকি, সীমাবদ্ধতা এবং সক্ষমতা থেকে ক্ষয়ক্ষতিকে বিবেচনা করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। আরেক অধিবেশনে মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘এনার্জি অ্যান্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের’ গবেষক জোনাথান কিম বলেন, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড অবশ্যই অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া জরুরি। বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ তৃতীয় দিনের এক অধিবেশনে সর্বজনীন, সমন্বিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জলবায়ু অর্থায়নব্যবস্থা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
বলা হয়ে থাকে, এই ক্ষয়ক্ষতি তহবিল বিষয়ে প্রথম বিশ্ব নজর তৈরি করে ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো। জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. সালিমুল হক ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বিষয়টিকে জতিসংঘের কাঠামোতে যুক্ত করার জন্য বহু কাজ করেছেন। কথা বলে জানতে পারলাম, এই ক্যারিবীয় দেশগুলোর অনেকেই তাকে মনে রেখেছে। এন্টিগুয়া-বারবুডা, ফিজি, টুভালু, মালদ্বীপ, সামোয়া, ত্রিনিদাদ-টোবাগোর মতো ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র এবং তাদের জলবায়ুগত ঝুঁকি আমরা খুব একটা জানি না। দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে অঙ্গীকার নেওয়া ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ বিষয়ে ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো কী বলছে? ‘গ্রিন হাউজ গ্যাস ম্যানেজমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মল্লি হোয়াইট বলেন, ‘আমরা যেভাবে প্রশমন, নিঃসরণ, অবদান এবং ক্ষতিপূরণের হিসাব করি এবং গবেষণার যে পদ্ধতি ব্যবহার করি, এসব সব সময় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জলবায়ুগত ঝুঁকিকে তুলে ধরে না। এন্টিগুয়া, ত্রিনিদাদ, পানামা, সিসিলিস কিংবা ফিজির সামগ্রিক ঝুঁকি এবং ক্ষয়ক্ষতিকে কোনোভাবেই সামষ্টিক অর্থনীতির চশমায় দেখলে হবে না।’
জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কি তহবিলের ক্ষেত্রে এখনো মনোযোগ কেবলমাত্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ঘিরে? কিন্তু বাংলাদেশের উপকূল, হাওর, চর কিংবা বরেন্দ্র অঞ্চলে গেলে আমরা কী দেখি? গ্রাম ছেড়ে, জন্মমাটি ছেড়ে, কৃষি ছেড়ে বহু মানুষ শহরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। শহরে এদের জায়গা হচ্ছে দূষিত, নাগরিকসেবাবঞ্চিত ‘বস্তিতে’। এই জলবায়ু-উদ্বাস্তু নগরদরিদ্রদের ক্ষয়ক্ষতি ও তহবিল বিষয়ে দুবাই জলবায়ু সম্মেলনের সিদ্ধান্ত আমরা এখনো জানতে পারিনি। এ বিষয়ে কর্মরত ইন্দোনেশিয়ার ‘রুজাক সেন্টার অব আরবান স্টাডিজ’ নামের এক বেসরকারি সংস্থার পরিচালক এলিসা সুতানুদজাদজা এক আলোচনায় বলেন, ‘নগরদরিদ্রদের জলবায়ুজনিত সমস্যাগুলো ভিন্ন রকমের এবং তাদের ক্ষতির ধরনও ভিন্ন। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড আলোচনায় নগরদরিদ্রদের যুক্ত করতে হবে।’ একই আলোচনায় ভারতের সিকিম রাজ্য সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সহসভাপ্রধান অধ্যাপক বিনোদ কুমার শর্মা বলেন, ‘একটি নগরের পরিকল্পনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অবশ্যই যুক্ত করতে হবে এবং জলবায়ু তহবিলগুলো এসব খাতেও সমন্বিতভাবে বণ্টন করা জরুরি।’
সম্মেলনের তৃতীয় দিনে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিশক্তি দক্ষতা’ বাড়াতে ১১৮ দেশ সম্মত হয়েছে। তবে বিপদ হলো একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপানসহ ২০টি রাষ্ট্র একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। রাশিয়ার প্যাভিলিয়নের সামনে দিয়ে আসার সময় হঠাৎ চেরনোবিলের কথা মনে পড়ে যায়। একটাই মাত্র পৃথিবী বাঁচানোর জন্য আমরা কি কোনো অঙ্গীকারে বসেছি, নাকি নতুন বাণিজ্য ও মুনাফার সুযোগ খুঁজছি? ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের’ নামে দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে কোনো ‘চিনাবাদাম’ দাবি করেনি বিশ^। দাবি করেছে ন্যায়বিচার। জলবায়ু ন্যায়বিচার। আর এই ন্যায়বিচার সুরক্ষায় বিশ্ব নেতৃত্ব দায়বদ্ধ, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
লেখক : লেখক ও গবেষক।
animistbangla@gmail.com