দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে সারা দেশে ৩০০টি আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলে ২ হাজার ৭১৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
যাচাই-বাছাই শেষে ৭৩১ জনের বাতিল এবং ১ হাজার ৯৮৫ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মনোনয়নপত্র বাতিলের হারের দিক থেকে দেশে নির্বাচনের ইতিহাসে এটি রেকর্ড।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ এবারের নির্বাচনে বৈধ ঘোষিত ও বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্রের তথ্য জানান। তবে কোন দলের কতজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে বা কী কারণে বাতিল হয়েছে, তা জানানো হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে রেকর্ড ২৬.৯১ শতাংশ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২৫.৬৪ শতাংশ, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ২০.৭৮ শতাংশ, ২০০৮-এর নির্বাচনে ২২.৬৮ শতাংশ, ২০০১ সালের নির্বাচনে ৪.৩৭ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৩.৬৫ শতাংশ, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১.৪৫ শতাংশ, ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ২.৩২ শতাংশ, ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ০.৩৪ শতাংশ এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ০.৩৩ শতাংশ মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছিল।
২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ৩ হাজার ৬৫ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ২ হাজার ২৭৯। আর বাতিল হয়েছিল ৭৮৬টি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ১ হাজার ১০৭ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ৮৭৭। আর বাতিল হয়েছিল ২৩০টি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২ হাজার ৪৫৬ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ১ হাজার ৮৯৯। আর বাতিল হয়েছিল ৫৫৭টি। ২০০১ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২ হাজার ৫৬৩ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ২ হাজার ৪৫১। আর বাতিল হয়েছিল ১১২টি। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ৩ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ২ হাজার ৯৮০। আর বাতিল হয়েছিল ১১৩টি। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ১ হাজার ৯৮৭ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ১ হাজার ৮৭৯। আর বাতিল হয়েছিল ১০৮টি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ৩ হাজার ৮৫৫ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ৩ হাজার ৭৯৯। আর বাতিল হয়েছিল ৫৬টি। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ১ হাজার ১২০ জন। তার মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ১ হাজার ৯৪টি। আর বাতিল হয়েছিল ২৬টি। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ১ হাজার ৫২৭ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ১ হাজার ৫২৭টি। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২ হাজার ৩৫২ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ২ হাজার ৩৪৪। আর বাতিল হয়েছিল ৮টি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ১ হাজার ২০৩ জন। এর মধ্যে বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ১ হাজার ১৯৯। আর বাতিল হয়েছিল ৪টি।
আগামী ৭ জানুয়ারি ভোট গ্রহণ হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে এবার রেকর্ড ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে তাদের অনেকেরই মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সংসদ সদস্যের কারও কারও মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া বাতিল হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মনোনীত বেশ কয়েকজনের মনোনয়নপত্র। যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিন গতকাল দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় বরিশাল-৪ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে ইসি।
গত শুক্রবার থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের কাজ শুরু করেন। গতকাল ৩০০ আসনের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের ১ শতাংশের সমর্থনসংবলিত স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তারা দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে কয়েকজনের সই যাচাই করে থাকেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে সমর্থনসূচক সইয়ে গরমিলের কারণে। এমনকি কারও কারও মনোনয়নপত্রে মৃত ব্যক্তির সমর্থনসংবলিত স্বাক্ষর পাওয়া গেছে।
মনোনয়নপত্র জমা, বাতিল ও বৈধ ঘোষণার অঞ্চল অনুযায়ী তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রংপুর অঞ্চলে ২৭৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৬৯টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ২০৯ জনের। রাজশাহী অঞ্চলে ৩৬৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১১০টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ২৫৯ জনের। খুলনা অঞ্চলে ৩২২ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৯৪টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ২২৮ জনের। বরিশাল অঞ্চলে ১৭৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৮টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ১৩৫ জনের। সিলেট অঞ্চলে ১৬০ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৫টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ১২৫ জনের। ঢাকা অঞ্চলে ৪৩১ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১১৪টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ৩১৭ জনের। ফরিদপুর অঞ্চলে ১০৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ২৩টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ৮০ জনের। কুমিল্লা অঞ্চলে ৩৫৫ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১২০টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ২৩৫ জনের। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৯৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৪৪টি বাতিল এবং বৈধ হিসেবে গৃহীত হয়েছে ১৫৪ জনের।
আজ মঙ্গলবার থেকে বাতিল হওয়া মনোনয়ন ফিরে পেতে ইসিতে আবেদন করা যাবে। তফসিল অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রার্থীদের আপিল গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা হবে। ১৭ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। ১৮ ডিসেম্বর প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৩ হাজার ৬৫ জন মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৮৬৫ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ১ হাজার ১০৭ জন। তবে ওই নির্বাচনে ২৩০ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়, ৩৩৪ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন এবং ৫৪৩ জন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
ঋণখেলাপি ১১৮ জনের মনোনয়নপত্র জমা : ইসির অনুরোধে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া ব্যক্তিদের সিআইবি তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যাচাই-বাছাইয়ে অন্তত ১১৮ জন ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। ইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ তথ্য জানা যায়।
আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। তাই মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থীর দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। কোনো প্রার্থী ঋণখেলাপি থাকলে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন। এ কারণে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারাও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকেন। এ ছাড়া আপিল শুনানির সময়ও নির্বাচন কমিশনে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের ঠেকাতে ব্যাংক কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন।
গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রার্থীদের নামে খেলাপি ঋণ থাকলে তা মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে নবায়ন বা পরিশোধ করতে হয়। যথাসময়ে ঋণ নবায়ন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রার্থী হতে পারেন। অন্যথায় প্রার্থী হতে পারবেন না।
শেষ দিনে আলোচিত যাদের বাতিল : বরিশালের ছয়টি আসনে গতকাল ১০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এর মধ্যে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় বরিশাল-৪ আসনের আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী দলটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এ ছাড়া বরিশাল-৬ আসনের বাকেরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও বৈধতা পাননি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. শামসুল আলম চুন্নু।
চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট চেয়ারম্যান এমএ মতিন এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীসহ ৩০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
টিকেছেন মুরাদ হাসান : জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসনের আলোচিত বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং অফিসার। তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচনায় আসা মুরাদ হাসানকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল।
স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থনকারী মৃত : মৌলভীবাজার-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ আবদুর রহিম শহীদের সমর্থনকারীর তালিকায় মৃত ব্যক্তির জাল স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। তদন্তের জন্য তার মনোনয়নপত্র স্থগিত করেছেন রিটার্নিং অফিসার। গতকাল আবদুর রহিম শহীদের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় দেখা যায়, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় মোট ভোটারের এক শতাংশের সমর্থন স্বাক্ষরসহ জমা দিয়েছেন। সেখানে তার সমর্থনকারী হিসেবে নাম থাকা মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাশিমপুর এলাকার বশির মিয়া ১১ মাস আগেই মারা গেছেন। এ ছাড়া আরেক সমর্থনকারী জেলি বেগমের ভোটার ঠিকানায় এ নামে কোনো ভোটার পাওয়া যায়নি।
* প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিরা