১৯৭১ সালে বিপর্যয়কর পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানসহ বেশ কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখতে ১৯৭২-এর জুলাই মাসে একটি কমিশন গঠন করেন পাকিস্তানের তখনকার রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলি ভুট্টো। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ছয় সদস্যের এই কমিশন হামুদুর রহমান কমিশন নামে পরিচিত। হামুদুর রহমান ছিলেন একজন বাঙালি মুসলিম। ১৯৭৪ সালে তার কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ প্রতিবেদন জুলফিকার আলি ভুট্টোর কাছে হস্তান্তর করে। যুদ্ধের ৫০ বছর পার হলেও প্রতিবেদনটি আজও সরকারিভাবে প্রকাশ করেনি পাকিস্তান। সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হক ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝোলালেও প্রতিবেদনটি প্রকাশে সাহস দেখাননি।
তবে ছয় অনুচ্ছেদের এই প্রতিবেদনটির ফাঁস হওয়া কিছু অংশ প্রকাশ করে ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়া টু ডে। কিছুদিন পর পাকিস্তানি প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ডন তাদের সম্পাদকীয়তে প্রতিবেদনটির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে। প্রতিবেদনটির ফাঁস হওয়া অংশ পর্যালোচনা করলে জানা যায়, গণহত্যার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিশন কীভাবে বাঙালি জাতিকে হেয়প্রতিপন্ন করেছিল। কী নির্লজ্জভাবে তথ্য বিকৃতি ঘটিয়ে পাকিস্তানি জেনারেলদের পক্ষে সাফাই গেয়েছিল। তবে প্রতিবেদনের কিছু অংশে বেশ কিছু সেনা কর্মকর্তার সমালোচনা করা হয়। বিশ্লেষকরা বলেন, এটা ছিল ধূর্ত ভুট্টোর চালাকি। তিনি এই কমিশনকে চতুরতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি তার অপছন্দের সেনা কর্মকর্তাদের দূরে সরিয়ে দেন। এছাড়া সেনাবাহিনীতে ইচ্ছামতো পদোন্নতি দিয়ে শক্তিশালী বলয় তৈরি করেন। যদিও ভুট্টোর শেষরক্ষা হয়নি।
বিচারপতি হামুদুর রহমান কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করেছেন। শুরুতে তার কমিশন দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে পারেনি। কারণ এই যুদ্ধের মূল কুশীলবরা তখনো ভারতে বন্দি। ১৯৭৪ সালে তারা দেশে ফিরলে কমিশনের কাজে অগ্রগতি আসে। গ্যারিসন শহর অ্যাবোটাবাদে স্থাপিত বিশেষ কার্যালয়ে ৭৩ জন আমলা ও শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেন। সব মিলিয়ে কমিশন ৩০০ ব্যক্তির সাক্ষ্য শোনেন। কিন্তু এতকিছুর পর কমিশন যে প্রতিবেদন তৈরি করেছিল তা ছিল সত্যের অপলাপ। এক ধরনের নিষ্ঠুর প্রহসন। বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের প্রতি তাচ্ছিল্য। আর ইতিহাস বিকৃতির ঘৃণ্য অপচেষ্টা।
হামুদুর রহমান কমিশন উল্লেখ করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বাংলাদেশে মাত্র ২৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ চলাকালে ইস্টার্ন কমান্ডের বিভিন্ন দপ্তর থেকে পাঠানো প্রতিবেদন থেকে তারা এ তথ্য নিয়েছিল। কী নিদারুণ পরিহাস! মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা মাত্র ২৬ হাজার? যা আবার নির্ধারণ করা হয়েছে হানাদারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী। যার ভিত্তিতেই কিনা ১৯৭১ সালে তাদের দোসর জামায়াত-শিবির দাবি করে মুক্তিযুদ্ধে মারা গেছেন মাত্র ৩০ হাজার মানুষ। জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন পুস্তিকায় এ রকম তথ্য বারবার প্রকাশিত হয়েছে। যাই হোক, নিহতের সংখ্যা নির্ধারণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যে উৎস ব্যবহার করা হয়েছিল তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তবে নিহত বা গণহত্যার তথ্য গোপন করতে চাইলেও কমিশনে দেওয়া অনেকে তথ্যেই পাকিস্তানি বর্বরতার চিত্র উঠে এসেছে। যেমন কমিশনের ২৬০ নম্বর সাক্ষী লে. জে. মনসুরুল হক কমিশনে দেওয়া তার জবানিতে বলেছেন, ‘যথেচ্ছা হত্যা ও লুটপাট পাকিস্তানের শত্রুদের পক্ষে কাজ করেছে। এই ধরনের নির্মম কঠোরতার ফলে আমরা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সমর্থন হারিয়েছি। কুমিল্লা সেনানিবাসের এক ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি কমিশনে সাক্ষ্য দেন, ২৫ মার্চের পর শুধুমাত্র এক সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল ১৭ জন বাঙালি অফিসার ও ৯১৫ জন সেনাসদস্যকে।’ এই যদি হয় এক দিনের অবস্থা তাহলে ৯ মাসে তারা কী রকম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। যদিও সে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয় বলে মনে করেছে কমিশন। প্রতিবেদনের আরেক সাক্ষী লে. কর্নেল আজিজ আহমেদ খান তার সাক্ষ্যে বলেছেন, ‘ব্রিগেডিয়ার আরবার আমাকে জয়দেবপুরের সব বাড়ি ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যে হুকুম আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। এছাড়া জেনারেল নিয়াজি ঠাকুরগাঁ ও বগুড়ায় আমার ইউনিট পরিদর্শনে এসে বলেছিলেন এখনো পর্যন্ত আমি কতজন হিন্দুকে হত্যা করেছি। এরপর মে মাসে একটা লিখিত আদেশ জারি করা হয়েছিল হিন্দুদের নির্বিচারে হত্যা করার জন্য।’
এছাড়া নির্যাতনের শিকার নারীদের সম্পর্কে কমিশন যেসব তথ্য তুলে ধরেছে তা রীতিমতো রোমহর্ষক, অপমানজনক। পাকিস্তানি সেনা আর প্যারা মিলিশিয়া বিভিন্ন বাহিনীর সাফাই গাইতে গিয়ে কমিশন বলেছে, দুই লাখ নারীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি অবান্তর। এক্ষেত্রে কমিশন ব্রিটিশ এক চিকিৎসক দলের উদাহরণ দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে স্বেচ্ছায় গর্ভপাত ঘটানোর জন্য এক ব্রিটিশ চিকিৎসক দল বাংলাদেশে আসে। কমিশন উল্লেখ করেছে সেই দলটি ১০০ জন নারীকেও পায়নি গর্ভপাতের জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে যারা ৯ মাস ধরে নির্যাতিত হয়েছেন তারা কি ৭২ সালে গর্ভপাতে আগ্রহী হবেন। আর একটি মাত্র চিকিৎসক দলের কাছে সারা দেশ থেকে কতজন নারী ছুটে যাবেন? বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় সেটা কতটা বাস্তবসম্মত? এছাড়া ব্রিটিশ ঐ চিকিৎসক দলের তথ্য কমিশন কার কাছ থেকে কীভাবে পেয়েছিল তা উল্লেখ করেনি কমিশন। সর্বোপরি এই কমিশন নারী নির্যাতন নিয়ে যে ভাষায় যেভাবে তথ্য উত্থাপন করেছে তা রীতিমতো ভয়ংকর, সত্যের অপলাপ।
তবে ইস্টার্ন কমান্ডে শোচনীয় পরাজয় ও ভুল রণকৌশলের জন্য বেশ কিছু শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে এই কমিশন তাদের বিচারের আওতায় আনার সুপারিশ করে। তারা হলেন সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান, প্রধান সেনা আইন প্রশাসক জেনারেল আব্দুল হামিদ খান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান, মেজর জেনারেল মিঠ্ঠা, মেজর জেনারেল উমার। এছাড়া দায়িত্বে অবহেলার জন্য অভিযুক্ত করা হয় লে. জেনারেল নিয়াজি, লে. জেনারেল জমশেদ, লে. জেনারেল এম. রহিম খান, এরশাদ আমিন খান, বি.এম. মোস্তাফা ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সিদ্দিকীকে। তাদের বিরুদ্ধেও সামরিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে কমিশন। যার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়া ঐ প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তা চাইলেও কোনো জবাব দেয়নি পাকিস্তান।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে বড় বিষয় ছিল গণহত্যার বিষয়টি পাকিস্তানের তরফ থেকে স্বীকার করে নেওয়া। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বিষয়টি মেনে নেয়নি পাকিস্তান। জুলফিকার আলি ভুট্টো থেকে শুরু করে সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফসহ অনেক পাকিস্তানি নেতা বাংলাদেশ সফর করেছেন, কিন্তু গণহত্যার প্রশ্নে তারা ছিলেন নিশ্চুপ। এমনকি বর্তমানেও পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় কোনো নথি বা তথ্য-উপাত্তে বাঙালি নিধনযজ্ঞের কথা স্বীকার করা হয় না। এছাড়া পাকিস্তানি পাঠ্যপুস্তকেও বিষয়টি অস্বীকার করা হয়।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা)