চলে গেলেন হৃদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ

দেশের খ্যাতিমান হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, রাজধানীর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব.) ডা. আবদুল মালিক আর নেই। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত এই বরেণ্য চিকিৎসকের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অধ্যাপক ডা. মালিকের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

ডা. মালিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। শোকবার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অধ্যাপক মালিক হাজার হাজার হৃদ্রোগীর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সব সময়ই আন্তরিক থেকেছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত এই হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞের অবদান দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

অধ্যাপক ডা. মালিক স্ত্রী, এক মেয়ে, দুই ছেলে, জামাতা, ছেলের বউ, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। স্ত্রী আশরাফুন্নেসা খাতুন। তার মেয়ে ডা. ফজিলাতুন্নেছা মালিক ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক, জামাতা বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জন ও নিটোরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আওয়াল রিজভী। ছেলে মাসুদ মালিক ব্যবসায়ী ও অপর ছেলে মনজুর মালিক বর্তমানে কানাডাপ্রবাসী।

অধ্যাপক ডা. মালিকের প্রথম জানাজা রাজধানীর জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বাদ জোহর অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় জানাজা হয় বাদ আসর শ্যামলীর এসওএস মসজিদে। বাদ মাগরিব তৃতীয় জানাজা হয় মিরপুর-২-এর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। পরে মরদেহ রাতে হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা হয়।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) শাহাজাদী সুলতানা ডলি দেশ রূপান্তরকে জানান, আজ বুধবার সকালে মরদেহ সিলেটে নিয়ে যাওয়া হবে। আরেক দফা জানাজা শেষে বাদ আসর সিলেটের পশ্চিম নোয়াগাঁওয়ে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

ডা. আব্দুল মালিকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ২০২৩ (কপ ২৮) উপলক্ষে মন্ত্রী বর্তমানে দুবাইয়ে রয়েছেন। সেখান থেকে এক শোক বাণীতে তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক মালিক কেবল বাংলাদেশেই নয়; বরং উপমহাদেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে এক বর্ষীয়ান উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশে চিকিৎসাক্ষেত্রে তার অবদান বলে শেষ করা যাবে না। এ রকম মহান ব্যক্তিত্বের মৃত্যুজনিত ক্ষতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তিনি ছিলেন আমাদের সবার জাতীয় সম্পদ।’

অধ্যাপক মালিকের মৃত্যুতে শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের, জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ফয়জুল হাকিম, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) সভাপতি রাশেদ রাব্বি ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেলসহ বিভিন্ন সংগঠন।

হৃদরোগ চিকিৎসার এই পথিকৃৎ ১৯২৯ সালের ১ ডিসেম্বর সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই ইউনিয়নের পশ্চিমভাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সিলেট থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন ১৯৪৯ সালে। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে এমবিবিএস শেষ করেন ও ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মেডিকেল কোরে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে সরকার তাকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠায়। এরপর ১৯৬৪ সালে তিনি এমআরসিপি পাস করেন এবং লন্ডনের হ্যামার স্মিথ হাসপাতাল অ্যান্ড পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল স্কুল থেকে কার্ডিওলজিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। ২০০১ সালে গঠিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বাস্থ্য, পরিবারকল্যাণ ও ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৪ সালে ডা. আবদুল মালিককে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়। ২০০৬ সালে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা পান তিনি।