নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। জামিনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কারামুক্তি। পরদিন বিএনপি ত্যাগ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের হয়ে ঝালকাঠি-১ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল। সব মিলিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরকে নিয়ে আলোচনা- সমালোচনা চলছে দেশজুড়ে। সবশেষ গত মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ফের আলোচনায় আসেন তিনি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার দুপুরে কর্মস্থল সুপ্রিম কোর্টে এসে একসময়ের সহযোগী বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের তোপের মুখে পড়েন শাহজাহান ওমর। ‘বেইমান’ ‘মোনাফেক’ ও ‘সরকারের দালাল’ আখ্যা দিয়ে তার দিকে তেড়ে যান আইনজীবীরা।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর একপর্যায়ে পুলিশের নিরাপত্তায় সুপ্রিম কোর্ট ত্যাগ করেন শাহজাহান ওমর। দুপুর ১২টার কিছু পর সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের নিচে এসব ঘটনা ঘটে।
এর আগে গতকাল বেলা ১১টার কিছুক্ষণ আগে শাহজাহান ওমর প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার কার্যালয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের তার পরিচিতি কার্ড দিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিছুক্ষণ পর তাকে জানানো হয় সাক্ষাতের অনুমতি মেলেনি। প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের নিচতলায় শাহজাহান ওমর তার ব্যক্তিগত চেম্বারে বসে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট বার ইউনিট শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজলকে ডেকে পাঠান। তবে কামরুল ইসলাম সাক্ষাৎ করতে অনীহা দেখিয়ে বার্তাবাহককে জানান, বেইমান-মোনাফেকের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করবেন না।
কিছুক্ষণ পর কামরুল ইসলামের ব্যক্তিগত কক্ষে এসে শাহজাহান ওমর তাকে নিয়ে আইনজীবীদের আপত্তিকর মন্তব্য ও কেন তিনি (কামরুল) সাক্ষাৎ করতে যাননি এ বিষয়ে জানতে চান। এ সময় কক্ষে আরও বেশ কয়েকজন আইনজীবী ছিলেন। জবাবে কামরুল ইসলাম শাহজাহান ওমরের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি মোনাফেক। দলের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। আপনার সঙ্গে আমাদের কোনো কথা নেই।’ একপর্যায়ে শাহজাহান ওমর সুপ্রিম কোর্টে তার পোস্টার (বিএনপিতে থাকাকালে) ছেঁড়া নিয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের কাছে কৈফিয়ত চান। এ সময় উপস্থিত আইনজীবীরা তাকে বলেন, ‘যে পোস্টারে বিএনপির চেয়ারপারসনের ছবি সেখানে আপনার ছবি থাকতে পারে না। এজন্য ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।’ একপর্যায়ে আইনজীবীদের সঙ্গে শাহজাহান ওমরের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, শাহজাহান ওমর তাকে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা শাহজাহান ওমরের বিরুদ্ধে উত্তেজক স্লোগান দিয়ে তার দিকে তেড়ে যান। একপর্যায়ে শাহজাহান ওমর পুলিশের নিরাপত্তায় সুপ্রিম কোর্ট এলাকা ত্যাগ করেন। রাজধানীর নিউমার্কেট থানার নাশকতার একটি মামলায় গত ৪ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন শাহজাহান ওমর (তখন তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান)। ২৯ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালত থেকে জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন। পরদিন নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র জমা দেন। এরপর তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে : সুপ্রিম কোর্ট থেকে বেরিয়ে দুপুরে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে যান শাহজাহান ওমর। তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ফোনে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। সেখানে তাকে দুপুরের খাবারে আপ্যায়িত করেন ঢাকা মহানগর ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ।
ডিবি কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়ে বের হয়ে শাহজাহান ওমর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ইদানীং বিভিন্নভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছি। বিভিন্ন মানুষ আমাকে অকথ্য ভাষায় কথা বলে। মাঝেমধ্যে আমার ফোনে আমাকে না পেয়ে আমার মেয়ের ফোনে, স্ত্রীর ফোনে, ছেলে ও আমার জুনিয়র আইনজীবীর ফোনে এমনকি আমার বন্ধুবান্ধবের ফোনেও কল করে আজেবাজে কথা বলে। এজন্যই আমি ডিবি অফিসে জানাতে আসলাম।’
নিজের নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনী আচরণবিধি ভেঙে জনসভা ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং। অনেক দিন পর এলাকায় গিয়েছিলাম। যেহেতু আমি বিএনপি করতাম, তাই সেখানে বিএনপির অনেক লোক ছিল। আমরা সেখানে সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছি। আমার লাইসেন্স করা পিস্তল আছে। সেটা আমার সঙ্গে ছিল এবং সেটা আমি অফিসে রেখে চলে আসছি। ইটস আ মিসটেক, অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি। আমার এক লোক সেটা হাতে হাতে নিয়ে গেছে, ওখানে কোনো ফরমাল মিটিংও ছিল না।’
বিএনপির সঙ্গে বেইমানি করেছেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে শাহজাহান ওমর বলেন, ‘আজ যার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, কাল তার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নাও থাকতে পারে। আমি একটি রাজনৈতিক দল থেকে অন্য দলে গেলাম। এতে কি বেইমানি হয়ে গেল? বেইমানি তো ধর্মের বিষয়।’ নির্বাচন কমিশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো উগ্র আচরণ করেননি দাবি করে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করব না।’
এদিকে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের জানান, শাহজাহান ওমরের অভিযোগ তারা খতিয়ে দেখবেন।