এডিসের সঙ্গে দাপট দেখাচ্ছে কিউলেক্স

দুই মশার দাপটে অসহায় নগরবাসী। গ্রীষ্মকালীন ডেঙ্গু রূপ নিয়েছে বছরব্যাপী। এখনো প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে। এরইমধ্যে মৌসুমী কিউলেক্স মশাও ধারণ করেছে ভয়াবহ রূপ। নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া কিউলেক্স মশার দাপট প্রতিদিনই বাড়ছে, যা আগামী মার্চ পর্যন্ত থাকবে।

বছরজুড়ে রাজধানী ঢাকায় মশার দাপট থাকলেও মশা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তৎপরতায় কার্যকর সুফল মিলছে না। অথচ এ খাতে দুই সিটি করপোরেশন গড়ে শত কোটি টাকার বেশি খরচ করছে। বছরের পর বছর মশা ঢাকার ভয়াবহ সমস্যা হলেও কর্তৃপক্ষের মশা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে সত্যিকারার্থে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই।

কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সঠিক হিসাব আসছে না। বাছাই করা কিছু হাসপাতালের তথ্য দিয়ে আক্রান্তের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। সরকার থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে বাস্তব চিত্র তার চেয়েও বেশি। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের মতোই কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণেও সমানভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে।

তারা আরও বলেছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন যেভাবে কাজ করে, এতে মশা নিয়ন্ত্রণ হয় না। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে মশা বাড়ে। আবার একই নিয়মে মশা কমে যায়। দুই সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নগরবাসীকে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া মশা-কমা বাড়ায় তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গুতে মারা গেছে এক হাজার ৬৪১ জন। আর আক্রান্ত হয়েছে তিন লাখ ১৫ হাজার ৬২৩ জন। ৬ ডিসেম্বর ডেঙ্গুতে নতুন করে আক্রান্ত হয় ৫৬৬ জন। এসব আক্রান্ত ও মৃত্যুর বড় অংশ ঢাকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্যে আরও জানা যায়, দেশে প্রথম ডেঙ্গু সনাক্ত হয় ২০০০ সালে, সে বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় পাঁচ হাজার ৫৫১ জন; মারা যায় ৯৩ জন। এরপর সর্বোচ্চ আক্রান্ত ২০১৯ সালে, এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন, মারা যায় ১৬৪ জন। আর ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং মারা যায় ২৮১ জন। চলতি বছর এ যাবতকালের সব ধরনের রেকর্ড ভেঙ্গে আক্রান্ত, মৃত্যু ও স্থায়ীত্বের সময়কালে নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি করছে।

নগর সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরজুড়েই এডিস মশার প্রজনন ঘটছে। এরফলে এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস এখন আর মৌসুমি দুর্যোগ নয়, বছরব্যাপী দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। এডিসের সঙ্গে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কিউলেক্সে মশারও ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব থাকে। এডিস ও কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে নগর সংস্থা এখন বছরব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে পরিচালিত হচ্ছে না। এ কারণেই মিলছে না কাঙ্খিত সফলতা। বছরব্যাপী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ জনবল, যার সংকট রয়েছে। মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে থাকলে কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে কোনো চিন্তা করেন না। যখন ডেঙ্গির প্রকোপ বেড়ে যায় তখন নড়েচড়ে বসেন। যখন কিউলেক্স মশার উপদ্রব বাড়ে, তখন তারা নড়েচড়ে বসেন।

তারা আরও জানান, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার বক্সকালভার্ট ও কার্ভাড ড্রেন রয়েছে। যেগুলোতে দুই সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটাতে পারে না। ওই বদ্ধ জায়গায় পলিথিন, ডাবের খোসাসহ বিভিন্ন আবর্জনা পড়ে থাকে। দুই ভবনের মাঝখানের জায়গাগুলো আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। যে কারণে ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন হয় না। জমাটবদ্ধ এসব পানিতে কিউলেক্স ভয়াবহরূপে বংশ বিস্তার করছে। এসব স্থানে মশার প্রজনন ধ্বংস করতে কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। জলাশয়, খাল, নর্দমা ও যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক সামগ্রী ও ডাবের খোসার পানিতে ভয়াবহরূপে মশার বংশ বিস্তার ঘটাচ্ছে। মশক নিধনে দুই সিটির পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। তারপরও নগরবাসীকে মশার ধকল সইতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিটি করপোরেশন বলছে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ হচ্ছে, তাহলে মশা কমছে না কেন, নগরবাসী এমন প্রশ্ন করছেন। কার্যত মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য তেমন কোনো  কাজ হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ঢাকার মশক নিয়ন্ত্রণে সফল হতে সংশ্লিষ্টদের কাজকে চাকরি মনে করলে হবে না, এটা সেবা হিসেবে নিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ঢেলে সাজাতে হবে। তাহলে সফলতা মিলতে পারে। 

কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিটি করপোরেশন তো মশা নিয়ন্ত্রণ করে না, তাহলে মশা বাড়বে না কেন? যখন যে কাজ করা দরকার, সেটা করে না। যেভাবে করা দরকার, সেভাবে করে না। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে মানুষকে জেল-জরিমানা করে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীত কমছে। এ বছর ডিসেম্বরেও শীত নেই। উপরন্তু বৃষ্টি হয়েছে, এতে করে এডিস ও কিউলেক্স দুই-ই বাড়বে। কিউলেক্স মশার ৯৫ ভাগ প্রজনন উৎস ডোবা, নালা ও জলাশয়। এসবের মালিকানা সরকারি সংস্থার। এজন্য সিটি করপোরেশন কাকে জরিমানা করবে, নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করছে না বলে মশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনকে অনেক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো কিছু শোনেন না। এজন্য বিশেষজ্ঞরা তাদের কোনো পরামর্শ দিতে চায় না। তবুও বলব, আগামী ডেঙ্গু মৌসুমের জন্য এখন থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন কিউলেক্স মশার প্রজনন রোধে ডোবা, নালা ও জলাশয় কার্যক্রম শুরু করেছে। ব্যক্তি ও বেসরকারি পর্যায়েও এ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফজলে সামছুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, এডিস মশা এখন আর মৌসুমি   মশা নেই। বছরজুড়ে এডিস নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তৎপর থাকতে হয়। চলতি মৌসুমে কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণে ডোবা, নালা ও জলাশয় পরিস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে সিটি করপোরেশন।