বেগম নয়, রোকেয়া খাতুনকে চিনুন

৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস। গত শতাব্দী থেকে নারী অগ্রযাত্রার ধারক হিসেবে দেশে যে নামটি প্রথম উচ্চারিত হয় তাহলো রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি ‘বেগম রোকেয়া’ নামে বেশি পরিচিত হলেও ‘বেগম’ তার নামের অংশ নয়। তার প্রকৃত নাম রোকেয়া খাতুন। জন্ম ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর, রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে। বাবা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ও মা রাহাতুন্নেসা। রোকেয়ার দুই বোন এবং তিন ভাই ছিলেন। তার মধ্যে বড় বোন করিমুন্নেসা এবং ভাই ইব্রাহীম সাবের তার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

অল্প বয়সে রোকেয়ার বিয়ে হয় ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। বিয়ের পরে রোকেয়ার জীবনে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। চলার পথে রোকেয়া তার ভাই, বড় বোন ও স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছিলেন। তিনি বিয়ের পর সে সময়কার রীতি অনুযায়ী স্বামীর নাম ধারণ করেন। তার নাম হয়ে যায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

রোকেয়ার শৈশব ও কৈশোরের সময়ে উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারে বাংলার চল ছিল না। আরবি ও উর্দুতে কথা বলা এবং পড়াশোনা হতো। কিন্তু রোকেয়া ও বোন করিমুন্নেসা ভাইয়ের কাছে বাংলা ভাষা শেখেন, সঙ্গে ইংরেজিও। স্বামী তার বাংলা শেখা এবং লেখালেখির ইচ্ছাকে সমর্থন দেন। পরে রোকেয়া বাংলা ভাষায় লেখালেখি অব্যাহত রাখেন। তিনি ইংরেজিতেও লিখেছেন। তার লেখা সুলতানা স্বপ্ন উপন্যাসিকাটি প্রথমে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এর বাংলারূপ গ্রন্থভুক্ত হয়।

রোকেয়া চেয়েছেন সাধারণ নারীরা লেখাপড়ার সুযোগ পাক। নারী শিক্ষার প্রসারে তিনি ব্যাপক কাজ করেছেন। সে সময়ে মেয়েদের কোনো স্কুল ছিল না। মুসলিম নারীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা  নারীদের জন্য পথ খুলে দিয়েছিলে। মুসলমান নারীদের সংগঠিত করার জন্য ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিন এ ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেন সেখানে মুসলিম নারীরা ধর্মের গোঁড়ামি ও কোরআনে নারীর জন্য বিধান নিয়ে ইতিবাচক বিতর্ক করতে পারেন।

কাজের পাশাপাশি তিনি অনেক লিখেছেনও। লেখক আবুল হোসেন মতিচুর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘লেখিকা বঙ্গীয় মোসলেম নারী সমাজের আদর্শ। তিনি অবরুদ্ধা, অবলা ভগিনীগণের দুরবস্থা দেখিয়া তাহাদিগকে জ্ঞান, শিক্ষা, নীতি, কর্ম ও স্বাধীনতায় প্রলুব্ধ করিবার জন্যে পুস্তকখানি লিখিয়াছেন।... পুস্তকে তিনি পুরুষদের বিরুদ্ধে এমন কিছুই বলেন নাই, যাহাতে পুরুষেরা আপত্তি করিতে পারে। ..... পুরুষকে কেবল অঙ্গুলি দ্বারা নির্দেশ করিয়া দিয়াছেন মাত্র।’ (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা কার্তিক ১৩২৮)। রোকেয়া বাংলায় লিখেছেন মতিচুর প্রথম ও দ্বিতীয় খ-, পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত ১৬টি প্রবন্ধ, উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’, অবরোধবাসিনী, ছোটগল্প ও রস রচনা ছয়টি এবং কয়েক গুচ্ছ কবিতাবলি। ইংরেজিতেও লিখেছেন ঝঁষঃধহধ’ং উৎবধস ও এড়ফ এরাবং, গধহ জড়নং। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত আবদুল কাদির সম্পাদিত রোকেয়া রচনাবলি প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৭৩ সালে।

রোকেয়ার পরিচয় একটি নয়, একাধিক। তিনি একাধারে লেখিকা, সমাজ সংস্কারক, আবার নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার কর্মী। তিনি ছিলেন সুবক্তা ও স্পষ্টভাষী। বঙ্গীয় নারীশিক্ষা সমিতির একটি সভায় তাকে সভানেত্রী করা হয়েছিল। সেখানে ভাষণদানকালে তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন এই যে মুসলমান বালিকাদের সুশিক্ষার উপায় কী? উপায় তো আল্লাহর কৃপায় অনেকই আছে, কিন্তু অভাগিনীগণ তাহার ফলভোগ করিতে পায় কই? আপনারা হয়তো শুনিয়া আশ্চর্য হইবেন যে, আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি। ভারতবর্ষে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীব কাহারা, জানেন? সে জীব ভারত-নারী! ... আমাদের ন্যায় অবরোধ-বন্দিনী নারী জাতির জন্য কাঁদিবার একটি লোকও এ ভূ-ভারতে নাই।’ তিনি ছিলেন সুরসিকও। সমিতির ভাষণে তিনি আরও বলেন, “আপনাদের নির্বাচন ঠিক হয় নাই। কারণ আমি আজীবন কঠোর সামাজিক ‘পর্দার’ অত্যাচারে লোহার সিন্দুকে বন্ধ আছি ভালোরূপে সমাজে মিশিতে পারি নাই এমন কি সভানেত্রীকে হাসিতে হয় না কাঁদিতে হয়, তাহাও আমি জানি না।” এভাবে রসিকতার সঙ্গে সমাজের নারীদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরলেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের সামনে। রোকেয়া সে সময় আরও বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষার এমন যে গড়পড়তা প্রতি ২০০ বালিকার মধ্যে একজনও অক্ষর চেনে না; প্রকৃত শিক্ষিতা মহিলা প্রতি ১০,০০০-এ একজন পাওয়া যাইবে না। তিন কোটি মুসলমানের মধ্যে বঙ্গের মাত্র একজন মুসলমান মহিলা গ্র্যাজুয়েট পাওয়া গেছে। স্ত্রীলোকেরা ভোটের অধিকার প্রাপ্ত হইয়াছে, কিন্তু ইলেকশনের সময় কলকাতায় মাত্র ৪ জন স্ত্রীলোক ভোট দিয়াছে।’ এভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখালে কে না বুঝবে কী দুর্দাশার মধ্যে আছে নারী জাতি!

রোকেয়া খাতুন, মনেপ্রাণে স্বাধীন চিন্তার একজন মানুষ। যিনি দূরদর্শী, সমাজকে দেখার এবং চেনার মতো চোখ ও মনের মানুষ তিনি। তিনি সমালোচনা করতেন কঠোরভাবে, সমাজকে জাগিয়ে তোলার জন্য। ডিসেম্বরের ৯ তারিখই তার প্রয়াণ দিবসও।

নারী জাগরণের ইতিহাসে বেগম রোকেয়ার অবদান অনস্বীকার্য। তার জীবন ও আদর্শ নারী মুক্তির জাজ¦ল্যমান ইশতেহার। নারী-পুরুষ সমানাধিকারের আন্দোলনের প্রতিটি মানুষের জন্য তিনি অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছেন।