বঙ্গবন্ধুর মুক্তিতে সরব বিশ্ব

অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসেবে ২৫ মার্চ কালরাতে ধানম-ির ৩২ নম্বর বাড়িতে পাকিস্তানি সেনারা হানা দেয় রাত ১টার দিকে। আধা ঘণ্টার এক ঝটিকা অভিযানে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫৭ ব্রিগেডের একটি দল। শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তারের পর ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর ওয়ারলেসে বার্তা দেয়  Big bird in the cage... others not in their nests... over.

৩২ নম্বর থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে নেওয়া হয় জাতীয় পরিষদ ভবনে। সেখানে থেকে ভোরের আলো ফোটার আগেই নেওয়া হয় ঢাকা সেনানিবাসের আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলসংলগ্ন একটা কক্ষে। সেখান থেকে পরদিন ২৭ মার্চ স্থানান্তর করা হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজে। সেখান থেকে ৩১ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে নেওয়া হয় করাচিতে। এরপর বেশ কিছুদিন শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। তাই শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। ক্রমাগত চাপের মুখে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য ডন বিস্তারিত কিছু না বলে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি প্রকাশ করে। তবে ভেতরে ভেতরে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে পাকিস্তান।

বঙ্গবন্ধুর বিচার নিয়ে পাকিস্তান সরকার একটি প্রেসনোট (ঙভভরপরধষ চৎবংং ঘড়ঃব) প্রকাশ করে ৯ আগস্ট ১৯৭১। দ্য ডনের ওইদিনের এ সংক্রান্ত সংবাদের শিরোনাম ছিল ঞৎধরষ ভড়ৎ ‘ধিমরহম ধিৎ ধমধরহংঃ ঢ়ধশরংঃধহ’। সংবাদের ভাষ্য, পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধানোর অভিযোগে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু হচ্ছে। বিচার হবে কঠোর গোপনীয়তায়, বিশেষ সামরিক আদালতে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এই সংবাদে আরও বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানকে আইন অনুযায়ী সব ধরনের সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু এ কথা বুঝতে কারও বাকি ছিল না যে, পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষ একটি প্রহসনের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

শেখ মুজিবুর রহমানের প্রহসনের বিচারের খবরে বসে থাকেনি বিশ্ব সম্প্রদায়। সামরিক কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের খবর প্রকাশের পরপরই বিবৃতি দেন জাতিংঘের তৎকালীন মহাসচিব উ থান্ট। এই বিচার প্রক্রিয়াকে তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে জাতিংঘের বিবৃতির কড়া প্রতিবাদ জানায় দেশটি। এ বিষয়ে ১৬ আগস্ট দ্য ডনের একটি সংবাদে বলা হয়, ভারত উৎসাহ দিয়েছে এমন বিবৃতি দিতে! অভ্যন্তরীণ যেকোনো সংকটে ভারতকে দায়ী করার অভ্যাস হাল-আমলের মতো তখনো ছিল পাকিস্তানের।

১৯৭১ সালে বিশ্ব জনমত ছিল বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ও শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে। তারই প্রতিফলন পাওয়া যায় শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার নিয়ে ফিনল্যান্ডের হেলসেংকিভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড প্রেস কাউন্সিলের একটি বিবৃতি। সংস্থাটি ২০ আগস্ট ‘ঝঃড়ঢ় ংবপৎবঃ ঃৎরধষ: ৎবষবধংব ংযবরশয সঁলরনঁৎ ৎধযসধহ’ শিরোনামের একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যা পরদিন বিশ্ব গণমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রচার ও প্রকাশিত হয়েছিল। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘(ইধহমষধ উবংয). ঞযব ঃৎরধষ রং নবরহম যবষফ ংবপৎবঃষু, ধহফ হড় ড়হব শহড়িং যিধঃ রহ নবরহম ঢ়বৎঢ়বঃৎধঃবফ নু ঃযব সরষরঃধৎরংঃ ৎঁষবং ড়ভ চধশরংঃধহ.’ এ বিবৃতিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে বিচারের আওতায় আনারও নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে সমালোচনা উঠে আসে গোপন বিচারের। ‘যুদ্ধ বাধানোর’ যে অপরাধে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের কথা বলা হয়, তাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার প্রতিফলন হয় বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।

মুজিবের মুক্তি কামনা ৪২ জন পশ্চিম পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীর

বঙ্গবন্ধুর প্রহসনের বিচার যেমন চলছিল, ঠিক তেমনি তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাকে নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ বাড়ছিল। শুভবুদ্ধির সব মানুষই জানতেন, শেখ মুজিবুর রহমানের যেকোনো দণ্ড ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। আর তার নিঃশর্ত মুক্তির মাধ্যমেই এ সংকটের সমাধান হতে পারে। এমন বাস্তবতায় নভেম্বর মাসে সক্রিয় হন পাকিস্তানের ৪২ জন বুদ্ধিজীবী। তারা সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে ছিলেন রাজনীতিবিদ, শ্রমিক নেতা, সাহিত্যিক, আইনজীবী, সাংবাদিক, ছাত্রনেতা, সমাজকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজের সুধীজনরা। শেখ মুজিবের মুক্তি কামনা করা এ ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ইশতেক লাল পার্টির প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অবসরপ্রাপ্ত) আসগর খান ও লেনিন শান্তি পুরস্কার পাওয়া কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। তাদের বিবৃতি প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর। রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘চধশরংঃধহর ষবধফবৎং পধষষ ভড়ৎ ংযবরশয’ং ৎবষবধংব’. যাতে বলা হয়, ‘ঋড়ৎঃু-ঃড়ি চধশরংঃধহর ঢ়ড়ষরঃরপধষ ষবধফবৎং, ঃৎধফব ঁহরড়হরংঃং, ষধিুবৎং, লড়ঁৎহধষরংঃং, ৎিরঃবৎং, ংঃঁফবহঃ ষবধফবৎং, ংড়পরধষ ড়িৎশবৎং ধহফ ঁহরাবৎংরঃু ঢ়ৎড়ভবংংড়ৎং ুবংঃবৎফধু (ঘড়াবসনবৎ ৪) ধঢ়ঢ়বধষবফ ঃড় চৎবংরফবহঃ ণধযুধ কযধহ ভড়ৎ ঃযব রসসবফরধঃব ৎবষবধংব ড়ভ ঝযবরশয গঁলরনঁৎ জধযসধহ.’ বামপন্থি এ বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতির পেছনে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট ছিল। কারণ কিছুদিন আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ‘নিউজউইক’-এ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিল, ‘যদি জাতি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি চায় তাহলে সে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।’

পশ্চিম পাকিস্তানে লাহোর অঞ্চলটি ছিল কট্টর মুজিববিরোধী এলাকা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের লাহোর সফরের আগে এ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। জান্তা সরকার তাদের এ আবেদনে কর্ণপাত না করলেও এ বিবৃতির প্রভাব ছিল অপরিসীম। বিবৃতিটি ঐতিহাসিকভাবেও অমূল্য। কারণ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি চেয়ে এ ধরনের আবেদন সত্যিই অনন্য, অসাধারণ ঘটনা।

ডিসেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের সঙ্গে স্বল্প সময়ের সর্বাত্মক যুদ্ধে কুপোকাত হয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। দুই ফ্রন্টে ব্যাপক মার খেয়ে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় খোলা আকাশের নিচে হাজার হাজার মানুষের সামনে আত্মসমর্পণ করে টাইগার নিয়াজি। নির্লজ্জ নিয়াজি অস্ত্র সমর্পণ করে কাতরকণ্ঠে যৌথ কামান্ডের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিল। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সেই সুযোগও পেয়েছিল বর্বর পাকিস্তানিরা। এদিকে তখনো কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান। তবে এমন পরিস্থিতিতে তার বিচার আর এগিয়ে নেওয়ার সাহস পায়নি পাকিস্তান। এক বিবৃতিতে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত ঘোষণা করে দেশটি। রায়ও আর ঘোষিত হয়নি। বরং প্রবল গণরোষে পদচ্যুত হয় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন জুলফিকার আলি ভুট্টো।

উচ্চাকাক্সক্ষী, চতুর ভুট্টো ক্ষমতায় এসেই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। ২৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সিহালা রেস্ট হাউজে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন ভুট্টো। কাতরকণ্ঠে যেকোনো কাঠামোতে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার আবেদন জানান বঙ্গবন্ধুর কাছে। সে সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকা ড. কামাল হোসেন লেখককে জানিয়েছেন, নামকাওয়াস্তে হলেও পাকিস্তান টিকিয়ে রাখতে শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের পা ধরা বাকি রেখেছিলেন ভুট্টো। এরপর ৭ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ শেখ মুজিব ফেরেন স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়