মামলার পর সম্পদ বিক্রি করে কানাডা যাওয়ার তোড়জোড়

রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপক (শিপিং) মো. এমদাদুল হক ও তার স্ত্রী পারভীন হকের অন্তত দেড় কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি। এ ছাড়া তারা দুজনে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

যমুনা অয়েলের সাবেক এই কর্মকর্তা চট্টগ্রামের সাকিন-সুলতানপুর গ্রামের রাজা মিয়ার ছেলে। আর তার স্ত্রী পারভীন হক একই জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ছোট হাতিয়ার মির্জাখীল এলাকার মিয়াবাড়ির মৃত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মেয়ে। বর্তমানে তারা দুজনে চট্টগ্রাম শহরের ইক্যুইটি এলাকার মেহেদীবাগ রোডের ৬১১/সি বাড়িতে বসবাস করছেন।

এমদাদুল হক ও পারভীন হকের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠে ২০১৯ সালে। এরপর তা অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় (চট্টগ্রাম-১)। দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্য যাচাই করে তাদের অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জুয়েল মজুমদার সম্প্রতি তাদের দুজনের বিরুদ্ধে দুদকে (সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১) পৃথক মামলা করেছেন।

এমদাদুল-পারভীন দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে কানাডায় বসবাস করেন। দুদকের মামলার পর তাদের সব সম্পদ বিক্রি করে কানাডা পাড়ি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইতিমধ্যে তারা ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপনও দিয়েছেন এমন তথ্যের সত্যতা পেয়েছে দেশ রূপান্তর।

চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগে এমদাদুল হকের ২ হাজার ৩৭০ বর্গফুটের যে ফ্ল্যাট রয়েছে, সেটি বিক্রির জন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে। নোভান প্রপার্টিজ নামে চট্টগ্রামের একটি কোম্পানি তার ওই ফ্ল্যাট বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।

ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হলে নোভান প্রপার্টিজের একজন কর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্ল্যাটটি যমুনা অয়েলের সাবেক কর্মকর্তা এমদাদুল হকের। আমরা বায়না করে রেখেছি। তিনি আমাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকাও নিয়ে গেছেন। সবকিছু ঠিক হলে মালিক (এমদাদুল হক) রেজিস্ট্রি করে দেবেন।’

চার বেডরুমের ওই ফ্ল্যাটটির আনুমানিক দাম ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে ধারণা দিয়ে তিনি আরও বলেন, তিনি (এমদাদুল) সবকিছু বিক্রি করে কানাডা চলে যাবেন। এজন্যই একে একে সব সম্পদ বিক্রি করা শুরু করেছেন।

দুদকের মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এমদাদুল হক দুদকে যে সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন সেখানে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলে ১ কোটি ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯০ টাকার সম্পদ অর্জনের কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু দুদকের যাচাইয়ে প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ ৭১ হাজার টাকার সম্পদের সন্ধান মিলেছে। সে হিসেবে তিনি প্রায় ১ কোটি ৫১ লাখ ৯৪ হাজার টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে গোপন করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এমদাদুল হক তার স্ত্রীর ভাই মো. সুজা আকবরের নামে ২০১০ সালে ৯১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনলেও তিনি তা সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করেননি।

পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয়সহ তার নামে ৩ কোটি ৩১ লাখ ২৬ হাজার ৭৯৫ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলেও তার গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস মিলেছে ২ কোটি ৫৮ লাখ ১৪ হাজার ৮৬৭ টাকার। ফলে তিনি প্রায় ৭৩ লাখ ১২ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।

২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার ৫৭০ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৩৮ লাখ ৩০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দেন এমদাদুল হক। তবে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে অন্যান্য সম্পদের পাশাপাশি নিজের কাছে বর্তমানে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা থাকার কথা স্বীকার করেছেন ২০১৫ সালে অবসরে যাওয়া যমুনা অয়েলের সাবেক এই কর্মকর্তা।

এমদাদুলের মতো তার স্ত্রী পারভীন হকের বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগ উঠেছে।

দুদকে ২০১৯ সালে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে স্থাবর ও অস্থাবর মিলে প্রায় ৪৭ লাখ ৪ হাজার টাকা সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দেন পারভীন হক। পরে দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে তার সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৭৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। সে হিসেবে তিনি ১ কোটি ২৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯০০ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে গোপন করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন দুদকের সহকারী পরিচালক জুয়েল মজুমদার।

পারভীন হকের ভাই সুজা আকবর চৌধুরীর নামে তার স্বামী এমদাদুল ৯১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে সেই তথ্য যেমন গোপন করেছেন, একইভাবে পারভীন হকও তার ভাইয়ের নামে একটি ফ্ল্যাট কিনে তথ্য গোপন করেছেন, যার বাজারমূল্য অন্তত ৬৪ লাখ টাকা।

পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয়সহ পারভীনের নামে ১ কোটি ৯৬ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৪ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে দুদক তার নামে গ্রহণযোগ্য (বৈধ) আয়ের উৎস পেয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ ৫৪ হাজার ৭৯২ কোটি টাকার। অর্থাৎ তার আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ ৭৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮২ টাকা, যা অবৈধ এবং আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

জানতে চাইলে এমদাদুল হক বলেন, ‘এটা আমাদের কোনো ঘটনা না। আমার স্ত্রীর ভাই সুজা ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদেশে থাকে। দেশে না থাকায় সে দুটো ফ্ল্যাট কিনেছিল আমার মাধ্যমে। আমি তার পক্ষ হয়ে এতে সই করেছিলাম। এটা এখনো রেজিস্ট্রিও হয়নি। আমার সই থাকার কারণে দুদক আমার নামে মামলা করেছে। তার তিন সন্তান বিদেশে থাকে। সে আর দেশে আসবে না। এগুলো এখন বিক্রি করে দিতে বলে। কিন্তু দুদকের কারণে এগুলো আর বিক্রিও করতে পারছি না। এজন্য সে উল্টো আমার ওপর ক্ষেপে আছে।’

‘অনেক চেষ্টা-তদবির করেছি। দুদককে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাজ হয়নি। এখন আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার শ্যালক একটি ফ্ল্যাট কিনেছিল। রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে দেখে ডেভেলপারের সঙ্গে জমি নিয়ে পিডব্লিউডির (গণপূর্ত অধিদপ্তর) মধ্যে একটা বিরোধ রয়েছে। পিডব্লিউডি এটার অনুমোদন না দেওয়ায় সে (শ্যালক) ওই ফ্ল্যাট কিনতে না পেরে আমাদের নিতে বলে। তখন আমি আট লাখ টাকা দিয়ে ওই ফ্ল্যাট আমার স্ত্রীর নামে আয়কর বিবরণীতে দেখিয়েছি। নাম-ধামও পরিবর্তন করা হয়নি।’

অবৈধ সম্পদের বিষয়ে এমদাদুল হক বলেন, ‘দুদক যেসব অভিযোগ করেছে সেগুলো সত্যি না। আমার কোনো অবৈধ সম্পদ নেই। এখনো আমার বৈধ টাকা আছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার মতো। দুদক বলেছিল আপনার ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার মতো সম্পদের অসংগতি রয়েছে। এটা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। এর পরও তারা মামলা করে দিল। এই বয়সে আর এগুলো ভালো লাগে না।’

এমদাদুল হকের স্ত্রী পারভীন হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের কোনো অবৈধ সম্পদ নেই। কী কারণে দুদক মামলা করেছে তা বুঝতে পারছি না। মেহেদীবাগে ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন এবং বায়না নেওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি।